কিলিয়ান এমবাপে নিয়মিত গোল করে শিরোনামে থাকলেও, থিয়েরি অঁরি মনে করেন ফ্রান্স দলের শিরোপা জয়ের পথে মাইকেল ওলিসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। অঁরি ফক্স স্পোর্টস-এ সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর বায়ার্ন তারকার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন যে এমবাপে ফ্রান্সের সেরা খেলোয়াড় হলেও, এই বিশ্বকাপে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেন ওলিসে।

ওলিসে সুইডেনের বিপক্ষে গোল না পেলেও পুরো ম্যাচে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি এমবাপে এবং বারকোলাকে গোল বানিয়ে দিয়েছেন এবং টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেছেন। অঁরি, যিনি এই বিশ্বকাপে ফক্স স্পোর্টসের হয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছেন, উপস্থাপকের প্রশ্নের জবাবে ওলিসের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে এমভিপি (সেরা খেলোয়াড়) সবসময়ই এমবাপে হবেন তার পরিসংখ্যানের কারণে, তবে ফ্রান্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ওলিসে।

ওলিসের বহুমুখী দক্ষতা ও খেলার বোঝাপড়া

অঁরি ওলিসেকে দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখেছেন। প্যারিস অলিম্পিকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ হিসেবে তিনি ওলিসেকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সেই দলে ওলিসে ছয় ম্যাচে দুটি গোল এবং পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে ফ্রান্সকে রৌপ্যপদক জিততে সাহায্য করেছিলেন। অঁরি ওলিসের ডিফেন্সিভ দক্ষতারও প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, যখন বল পায়ে থাকে না, তখন ওলিসে যা করেন, তা আর কেউ করে না। অনেক সময় অসাধারণ টেকনিক সম্পন্ন খেলোয়াড়েরা তাদের ডিফেন্সিভ দায়িত্বের কথা ভুলে যান, কিন্তু ওলিসে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

ওলিসে বায়ার্ন মিউনিখে বেশিরভাগ সময় রাইট উইংয়ে খেললেও, ফ্রান্স দলে দিদিয়ের দেশম তাকে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই নতুন ভূমিকায় ওলিসে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। অঁরি মনে করেন, ওলিসের ফুটবল বোঝার ক্ষমতা অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি খুব দ্রুত চিন্তা করতে পারেন এবং একজন অসাধারণ ফুটবলার। অঁরি তার কোচিংয়ের সময় ওলিসের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাকে ‘ভিন্নগ্রহের খেলোয়াড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ফ্রান্স দলে এমবাপে-দেম্বেলের সাথে ওলিসের রসায়ন দারুণ জমেছে। টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের করা ১৩টি গোলের মধ্যে পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেছেন ওলিসে। সুইডেনের বিপক্ষে তিনি তার প্রথম গোল পেতে পারতেন, কিন্তু তার ওভারহেড কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

জাতীয় দল বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই ওলিসে তার জাদুকরী বাঁ-পা এবং এক মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা এই মিডফিল্ডারের বাবা নাইজেরিয়ান এবং মা ফরাসি-আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। ফলে তার সামনে আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল।

তবে ওলিসে জানিয়েছেন যে তিনি ছোটবেলাতেই ফ্রান্সের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার মা ফরাসি এবং ছোটবেলা থেকেই তিনি ফ্রান্সে আসতেন, যার ফলে ফ্রান্সের সাথে তার একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি ফ্রান্সের হয়ে খেলতে পেরে গর্বিত। শৈশবে তিনি নিয়মিত ফ্রান্স দলের খেলা অনুসরণ করতেন এবং এই দলে অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় ছিলেন।

আর্সেনাল, চেলসি, ম্যানসিটি এবং রিডিংয়ের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা ওলিসে ইংল্যান্ডে বড় হলেও সবসময় ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলের আগ্রহ সত্ত্বেও তিনি ২০১৯ সালে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে যোগ দেন। পরে অনূর্ধ্ব-২১ এবং ২০২৪ সালের অলিম্পিক দলেও খেলেন।

ইংরেজিতে ফরাসির চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও, ওলিসে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে কখনোই দ্বিধায় ছিলেন না। তিনি আশা করেন, এটি বিশেষ কিছুর শুরু এবং ছোটবেলা থেকেই ফ্রান্সের হয়ে খেলা তার স্বপ্ন ছিল। এই স্বপ্ন পূরণ হলেও নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া এবং ইংল্যান্ড হতাশ হয়েছে। ২০২১ সালে নাইজেরিয়া তাকে আফ্রিকা কাপ বাছাইপর্বের জন্য রিজার্ভ তালিকায় রেখেছিল। দুই বছর পর, যখন তিনি ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২০ দলের খেলোয়াড় এবং ক্লাবে ভালো খেলছিলেন, তখন আলজেরিয়ার কোচও তাকে দলে টানার চেষ্টা করেন।

ইংল্যান্ড-আলজেরিয়াকে বাদ দিয়ে কেন ফ্রান্সের হয়ে খেলছেন ওলিসে?
ইংল্যান্ড-আলজেরিয়াকে বাদ দিয়ে কেন ফ্রান্সের হয়ে খেলছেন ওলিসে? Credit: jagonews24.com

আলজেরিয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবলার হিশেম ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, ‘মাইকেল ওলিসে, আমরা তোমার অপেক্ষায় আছি।’ এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিলেও ওলিসের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। প্রিমিয়ার লিগে ১০ গোল ও ছয় অ্যাসিস্ট করে আলোচনায় থাকা ওলিসেকে দিদিয়ে দেশম ফ্রান্সের দলে নেননি। সেই সুযোগে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেট তাকে পাওয়ার আশা করেছিলেন।

তবে সাউথগেট স্বীকার করেন যে তাকে ক্রীড়া নাগরিকত্ব পরিবর্তন করতে হতো এবং সেই প্রক্রিয়ায় সময় লাগত, যা ইউরোর আগে সম্ভব ছিল না। ইউরোর বদলে ওলিসে ফ্রান্সের হয়ে প্যারিস অলিম্পিকে খেলেন, যেখানে থিয়েরি অঁরির অধীনে তিনি দুটি গোল ও পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে দলকে রৌপ্যপদক জিততে সাহায্য করেন। অঁরি তখন বলেছিলেন যে ফ্রান্সের হয়ে খেলার তার ইচ্ছা তাকে শিহরিত করে। তিনি চাইলে ইংল্যান্ডের হয়ে ইউরো খেলতে পারতেন, কিন্তু তিনি ফ্রান্সের হয়ে অলিম্পিক খেলাকে বেছে নিয়েছিলেন। অঁরি ওলিসের এই সিদ্ধান্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। অবশেষে ২০২৪ সালে দিদিয়ে দেশম ওলিসেকে জাতীয় দলে ডাক দেন।

বর্তমানে ‘লে ব্লু’দের ১১ নম্বর জার্সিধারী ওলিসে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা এবং ফ্রান্সকে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জেতানোর লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

Source: bangla.thedailystar.net

অ র র মত এমব প স র হল ও ফ র ন স র সবচ য গ র ত বপ র ণ খ ল য ড ওল স image 2

সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।

By সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।