ব্রাজিলের কলকাতা সফর নিয়ে বিতর্ক
ব্রাজিল ফুটবল দল আগামী ৩ অক্টোবর কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তাদের মূল জাতীয় দল নিয়েই আসবে বলে জানানো হয়েছে, যা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। তবে এই ম্যাচের প্রয়োজনীয়তা এবং সময় নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় ফুটবলের বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ প্রশ্ন তুলেছেন।
মোহনবাগানের প্রাক্তন ফুটবলার হোসে ব্যারেটো মনে করেন, এই ম্যাচ ভারতীয় ফুটবলের প্রচারের জন্য একটি দারুণ সুযোগ। তিনি বলেছেন, ভারতে ক্রিকেট সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, তাই ব্রাজিলের মতো দলকে কাছ থেকে দেখা সমর্থকদের জন্য বড় প্রাপ্তি। এমনকি ব্রাজিলিয়ানদের কাছেও জাতীয় দলের ফুটবলারদের সামনে থেকে দেখা সবসময় সহজ নয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাজিল এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন অনেক ফুটবলার দলে আসছেন। তাই শেষ পর্যন্ত কারা ভারতে আসবেন, তা এখনও নিশ্চিত না হলেও, যে দলই আসুক না কেন, তা সমর্থকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হবে।
ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি
ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক ভাইচুং ভুটিয়া এই ম্যাচ নিয়ে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় রয়েছে। ভাইচুং বলেছেন যে, তিনি ব্রাজিলের আসা উচিত নয় এমন কথা বলছেন না, তবে ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান অবস্থা দেখে প্রশ্ন ওঠে যে এই ম্যাচ থেকে আসলে কী পেতে চাওয়া হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জামশেদপুর এফসি সরে যাচ্ছে, দল এশিয়ান গেমসে খেলছে না, এবং ভারতের ফিফা র্যাঙ্কিং প্রায় ১৪০-এর কাছাকাছি।
ভাইচুং ভুটিয়া আরও বলেছেন যে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো গোটা কাঠামোকে ঠিক করা। তার মতে, ভারতীয় ফুটবলের দশা এমন একটি পরিবারের মতো, যাদের ঠিক মতো খাওয়ারই জোটে না, অথচ ছেলের বিয়েতে শাহরুখ খানকে এনে নাচানোর পরিকল্পনা করছে। ব্রাজিলের মতো দলের বিরুদ্ধে ম্যাচ অবশ্যই আকর্ষণীয়, কিন্তু তার আগে ভারতীয় ফুটবলের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা আরও জরুরি।
জাতীয় দলের ডিফেন্ডার নিখিল পূজারিও এই ম্যাচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, একদিকে ব্রাজিলের ভারতে আসা উদ্যাপন করা হচ্ছে, অন্যদিকে আরও একটি ক্লাব তাদের ফুটবল দল তুলে নিচ্ছে। এতে প্রশ্ন ওঠে যে, ভারতীয় ফুটবল আসলে কোন দিকে এগোচ্ছে।
ভারতের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা সুনীল ছেত্রীও জামশেদপুর এফসি-র সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, জামশেদপুর প্রথম দলের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে শুনে তিনি সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছেন।
ম্যাচের গুরুত্ব ও খরচ
ব্রাজিলকে ভারতে আনার জন্য সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (AIFF), ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এবং একটি বেসরকারি সংস্থার মধ্যে চুক্তি হয়েছে। জানা গেছে, এই প্রকল্পে প্রায় ৬০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের উপ-মহাসচিব এম সত্যনারায়ণ এই ঐতিহাসিক ম্যাচ প্রসঙ্গে বলেছেন, ব্রাজিলের মতো একটি দেশকে ভারতে স্বাগত জানানো অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এটি ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে নিশ্চিতভাবেই একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। জাতীয় দলের পরিচালক সুব্রত পাল এই ম্যাচটিকে খেলোয়াড়দের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তার কথায়, এটি কেবলই আরেকটি ম্যাচ নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা একটি দলের বিরুদ্ধে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার এবং বড় স্বপ্ন দেখার এক দুর্লভ সুযোগ।
ব্রাজিল দল ২৫ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলে ভারতে আসবে। অক্টোবরের ফিফা উইন্ডোতে সেলেসাওদের তৃতীয় ম্যাচটি কলকাতার মাটিতেই হবে। ১৯৯২ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং চালু হওয়ার পর থেকে এটিই হতে চলেছে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ। ব্রাজিল বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

ব্রাজিলের মতো বিশ্ব শক্তির বিরুদ্ধে মাঠে নামা নিঃসন্দেহে ভারতীয় ফুটবলের জন্য একটি বড় ঘটনা। তবে এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও দেশের ফুটবলের কাঠামোগত সমস্যা, ক্লাব সংকট এবং র্যাঙ্কিংয়ের অবনতির বিষয়গুলি সামনে চলে এসেছে। তাই ৩ অক্টোবরের ম্যাচটি শুধু উৎসব নয়, ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান বাস্তবতারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে।
Source: eisamay.com
