মালভিনাস ব্যানার বিতর্কে ফিফার তদন্ত চায় যুক্তরাজ্যমালভিনাস ব্যানার বিতর্কে ফিফার তদন্ত চায় যুক্তরাজ্য

ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারানোর পর আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের মালভিনাস (ফকল্যান্ডস) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দাবি-সংবলিত একটি ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় যুক্তরাজ্য ফিফার কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, ফুটবলকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর উদযাপনের সময় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ‘দ্য মালভিনাস আর আর্জেন্টাইন’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য সরকার ফিফার কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিমন্ত্রী পিটার কাইল একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, খেলোয়াড়দের এই পদক্ষেপ ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত’ ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে ফিফা বিষয়টি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে, কারণ বিশ্বকাপের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো রাজনীতিকে ফুটবল থেকে আলাদা রাখা। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ফুটবলে রাজনীতির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।

ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এই ব্যানার প্রদর্শন করে দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জ মালভিনাসের (ব্রিটিশদের কাছে ফকল্যান্ডস) ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি তুলে ধরেন। তবে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন যে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের সঙ্গে মালভিনাস ইস্যুকে যুক্ত করা উচিত নয়।

১৮৩৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৮২ সালে এই ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল, যেখানে শত শত মানুষ প্রাণ হারান।

ফিফা এবং আইএফএবি’র কঠোর নিয়মাবলী রয়েছে যা ম্যাচ চলাকালীন বা মাঠের ভেতরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত স্লোগান, পতাকা এবং প্রতীক প্রদর্শন নিষিদ্ধ করে। আইএফএবি’র নিয়মাবলীতে বলা আছে যে, খেলোয়াড়দের কোনো পোশাকে বা সরঞ্জামে রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত স্লোগান, বিবৃতি বা ছবি থাকতে পারবে না। এছাড়াও, কোনো খেলোয়াড় এমন কোনো অন্তর্বাস প্রদর্শন করতে পারবেন না যা রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বার্তা বহন করে। এই নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় এবং দলকে ফিফা বা প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

সাবেক টটেনহ্যাম হটস্পার মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসো এবং সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিকে গ্যালারি থেকে সমর্থকদের দেওয়া একটি বিতর্কিত ব্যানার নিয়ে উদযাপন করতে দেখা যায়। ব্যানারটিতে লেখা ছিল— ‘মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার’

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এমন আবেগঘন জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার মালিকানা দাবির এই ব্যানার প্রদর্শন ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে ফিফার পক্ষ থেকে আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। লো সেলসো এবং ওতামেন্দি দুজনেই দীর্ঘদিন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন, তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর তাদের এমন আচরণকে অনেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং উসকানিমূলক হিসেবে দেখছেন।

এই বিতর্ক মাঠের বাইরেও তীব্র রূপ নেয় যখন আর্জেন্টিনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ এই উদযাপনে সমর্থন জানিয়ে পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনারই! তারা স্টেডিয়ামে এই ব্যানার নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু ভুলে গেছে যে আমরা এগুলো আমাদের রক্তে আর হৃদয়ে বহন করি।’

আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টাইনরা ‘লাস মালভিনাস’ নামে ডাকে। এই দ্বীপের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দুই দেশের বিরোধের ইতিহাস ১৯ শতকের নেপোলিয়নীয় যুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৭৭৪ সালে ব্রিটেন প্রথম এই অঞ্চলের মালিকানা দাবি করে এবং ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

এই উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে, যখন আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তা দ্বীপটি দখল করতে আক্রমণ চালায়, যা ইতিহাসে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনাসদস্যসহ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টাইন বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে একই ধরনের ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’ ব্যানার প্রদর্শন করায় আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল ফিফা। সেসময় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানায়, ওই কর্মকাণ্ড ফুটবলে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শন এবং দলীয় আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল।

উল্লেখ্য, দুই দেশের সমর্থকদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সেমিফাইনাল ম্যাচটিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও ফিফা আটলান্টার স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক বার্তাবাহী পতাকা বা ব্যানার বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এর মধ্যে মালভিনাস বা ফকল্যান্ডস-সংক্রান্ত দাবি-সংবলিত পতাকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

The entire argentina team could face punishment
The entire argentina team could face punishment Credit: dainikshiksha.com

ইতিহাসের সেই পুরোনো ক্ষত ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে টেনে আনায় এখন স্পেনের বিপক্ষে মেগা ফাইনালের আগে ফিফার নিষেধাজ্ঞার খড়গ ঝুলছে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ওপর।

Source: bangla.thedailystar.net

ম লভ ন স ব য ন র ব তর ক ফ ফ র তদন ত চ য য ক তর জ য image 2

সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।

By সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।