ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হওয়ায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (আর্জেন্টিনায় যা মালভিনাস নামে পরিচিত) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। এই ম্যাচটি শুধু একটি ফুটবলীয় লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চার দশকেরও বেশি পুরোনো এক রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের পর থেকে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ফুটবল ম্যাচ মানেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ দিয়ে চার মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন যে, সেই ম্যাচটি তাঁদের কাছে চার বছর আগের ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ ছিল।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব বিতর্ক
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত, যেখানে ব্রিটেন থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার মাইল। ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনা দাবি করে যে এই দ্বীপপুঞ্জ তাদের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে, ব্রিটেন ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে শাসন করে আসছে এবং দ্বীপের বাসিন্দারাও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত।
এই দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে ১৯৮২ সালে দুই দেশ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ৭৪ দিন স্থায়ী এই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। যুদ্ধে ব্রিটেন জয়লাভ করে। প্রায় ৩০ বছর পর ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৯৯.৮ শতাংশ বাসিন্দা ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন।
আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কির্নো সম্প্রতি ‘লা নাসিওন’ পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন, যেখানে তিনি ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের ‘কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপনকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ব্রিটেনকে ভূখণ্ডটি হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। কির্নো ২০১৩ সালের গণভোটকেও ‘অবৈধ’ দাবি করে ফকল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি হলো, সময় (অনেক বছর ধরে থাকলেই) কখনো একটি অবৈধ দখলদারিকে সার্বভৌমত্বে রূপান্তর করতে পারে না এবং এটি আর্জেন্টিনা প্রজাতন্ত্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকেও খণ্ডবিখণ্ড করতে পারবে না।
কির্নোর মতে, ১৯৮২ সালের যুদ্ধ এবং ২০১৩ সালের গণভোট ফকল্যান্ড বিরোধের সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব কোনো ‘দখলদার শক্তির কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপনকারী জনসংখ্যা’ দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব
আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে প্রকাশিত প্রবন্ধে কির্নো ফকল্যান্ডের ওপর আর্জেন্টিনার আইনি দাবির কথা তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দাবি কখনো ম্লান হবে না, আমরা হাল ছাড়ব না। ফকল্যান্ড হলো ইতিহাস, ভূখণ্ড, সমুদ্র, স্মৃতি ও নিয়তি। এটা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যকার একটা অঙ্গীকার। এটা এমন এক জাতির কণ্ঠস্বর যে জাতি আত্মসমর্পণ না করে দাবি জানাতে ও হাল না ছেড়ে অপেক্ষা করতে জানে।’ কির্নোর এই মন্তব্যগুলো মূলত আর্জেন্টিনা সরকারের দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ।
সম্প্রতি আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে তাঁরা ড্রেসিংরুমের ভেতর গান গাইছিলেন যে তাঁরা ‘মালভিনাসের জন্য’ বিশ্বকাপ জিতবেন। গত এপ্রিলে পেন্টাগনের একটি গোপন নথি ফাঁস হয়, যা থেকে জানা যায় যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্রিটেনর অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ফকল্যান্ডের ওপর ব্রিটেনর সার্বভৌমত্বের দাবি পুনর্বিবেচনা করছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে এই দ্বীপপুঞ্জ ‘আর্জেন্টিনার ছিল, আছে এবং সব সময় থাকবে।’
আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন যে, দ্বীপে বসবাসকারী সব ব্রিটিশ নাগরিকের ‘ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়া উচিত।’ এই গোপন নথি এবং আর্জেন্টিনার নেতাদের বক্তব্যগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

রেফারিদের নিরপেক্ষতা ও ফিফার নীতি
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হওয়ায় এই বিতর্ক আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। ফিফার একটি দীর্ঘদিনের নীতি রয়েছে যে, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোনো ম্যাচে ইংল্যান্ডের রেফারিদের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় না। একইভাবে, ইংল্যান্ডের ম্যাচেও আর্জেন্টিনার কোনো রেফারিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। এই নিষেধাজ্ঞা ৪৪ বছর আগের রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তৈরি হয়েছে।
এই নিয়ম শুধু নকআউট পর্বেই নয়, গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও মেনে চলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড ম্যাচে ইংল্যান্ডের রেফারি মাইকেল অলিভার বা অ্যান্থনি টেলরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। একইভাবে, আর্জেন্টিনার রেফারি ফাকুন্দো তেলোকে ইংল্যান্ডের কোনো ম্যাচ পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি। ফিফার রেফারিং বিভাগের প্রধান পিয়েরলুইগি কলিনার অধীনে এই রেফারি নিয়োগের দায়িত্ব থাকে। পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা এড়াতে কোনো রেফারি নিজের দেশের বা নিজের অঞ্চলের কোনো ক্লাবের ম্যাচও পরিচালনা করতে পারেন না।
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা সরকার ফকল্যান্ড দ্বীপটি দখল করে নেয়, যার ফলস্বরূপ ৭৪ দিন ধরে যুদ্ধ চলে।
Source: prothomalo.com
