মেসির ক্লান্তি ও ফাইনালের হতাশা
লিওনেল মেসিকে ঘিরে একসময় মনে হয়েছিল, বয়স যেন তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে না। মাঠে তিনি আরও তরুণ হয়ে উঠছিলেন। তবে, ফাইনালের দৃশ্য ছিল ভিন্ন। মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি আর সেই পরিচিত খেলোয়াড় নন, যিনি কিছুদিন আগেও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ নিয়ে খেলছিলেন। তার দৌড় ছিল কম, চোখে ছিল ক্লান্তি, এবং শরীর যেন বারবার থেমে যেতে চাইছিল। পুরো টুর্নামেন্টে যে খেলোয়াড় সময়কে হারিয়ে দিয়েছিলেন, ফাইনালে তাকেই সময় যেন ধরে ফেলল।
এই ক্লান্তি বয়সের কারণে ছিল না, বরং পুরো দলকে একা টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়া একজন মানুষের ক্লান্তি ছিল এটি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা যেন মেসিকে খুঁজতেই ভুলে গিয়েছিল। যে বলগুলো তার পায়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো অযথা তাড়াহুড়োয় হারিয়ে গেছে। যে মুহূর্তগুলোতে দলের সবচেয়ে সৃজনশীল খেলোয়াড়কে খুঁজে নেওয়া দরকার ছিল, সেখানে আর্জেন্টিনা অন্য লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। ফাউল, ধাক্কাধাক্কি, উত্তেজনা এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে তারা ম্যাচের ছন্দ হারিয়েছে।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির মুখটি তাই আলাদাভাবে চোখে পড়েছিল। তার চোখে জল ছিল, কিন্তু তা লুকানোর কোনো নাটকীয়তা ছিল না। ছিল শুধু নিঃশব্দ ক্লান্তি। সেই ক্লান্তি দেখে মায়া হয়। এবারের বিশ্বকাপে মেসি হয়তো সবচেয়ে উজ্জ্বল ফুটবলার ছিলেন, কিন্তু ফাইনালের রাত তাকে বিজয়ী নয়, পরাজিত হিসেবেই মনে রাখবে। ইতিহাস হয়তো তার গোল-অ্যাসিস্ট বা অসাধারণ পারফরম্যান্সের কথা লিখবে, কিন্তু সেই ইতিহাসের পাতায় আরেকটি ছবিও থাকবে—ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকা এক ক্লান্ত মানুষের।
ফুটবল কিংবদন্তিদের প্রতিক্রিয়া
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের বিকেলের ফাইনাল লিওনেল মেসির জন্য কোনো রূপকথা নিয়ে আসেনি, বরং এনেছে এক বুকভাঙা হাহাকার। ট্রফি মঞ্চের ঝলমলে আলোয় যখন তিনি রানার্সআপ মেডেল গলায় নিচ্ছিলেন, তখন তার চোখে ছিল নোনা জলের ধারা। তবে, মেসির চোখের জল কি শুধু একটি হারানো ট্রফির জন্য ছিল, নাকি এক মহাকাব্যের বিষাদময় শেষও ছিল?
মাঠের ওপাশে যখন স্প্যানিশ তরুণদের উল্লাস চলছিল, ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতে বসে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং থিয়েরি অঁরি তখন মেসির শেষটা নিয়ে কথা বলছিলেন। ইব্রাহিমোভিচ বলেন, “এই বিশ্বকাপে আমরা ওকে মন ভরে উপভোগ করেছি। আমি জানি বিশ্বকাপটা জিততে না পেরে ও ভীষণ দুঃখী। কিন্তু ও একটা অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ কাটিয়েছে। একা হাতে এই দলটাকে টেনে নিয়ে গেছে। ও যা করেছে, তা স্রেফ জাদুকরি।”
ইব্রাহিমোভিচ মেসির এই রূপটাকেই ব্যাখ্যা করে বলেন, “এই টুর্নামেন্টে কখনো মনে হয়েছে ও এই গ্রহেরই কেউ না, আবার কখনো একদম আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে!” স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলে বন্দী হয়ে মেসিকে বড্ড একাকী লেগেছে।
তবে, থিয়িয়েরি অঁরি মোটেও মেসির কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে রাজি নন। আর্সেনাল ও বার্সেলোনার এই কিংবদন্তি স্পেনের ট্যাকটিকসকে কৃতিত্ব দিয়ে বলেন, “আপনি মেসির বিপক্ষে বাজি ধরতে পারেন না। আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে স্পেনের মতো একটা দলই লাগত।” ডেনমার্কের সাবেক গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল পরিষ্কারভাবে বলেছেন, বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে মেসির মতো ফুটবলারকে মাপাটাই বোকামি।
স্মাইকেল বলেন, “হ্যাঁ, ও বিশ্বকাপে জেতার চেয়ে ফাইনাল হেরেছে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও-ই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। যেকোনো বাচ্চা যখন ওর দিকে তাকাবে, সে বুঝতে পারবে ফুটবল মানে শুধু জেতা নয়। ফুটবল মানে আপনি খেলাটাকে কী দিয়ে গেলেন। আর মেসি এই খেলাটাকে যা দিয়েছে, তার কোনো তুলনা হয় না।”
একই সুরে সুর মেলান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা অ্যালেক্সি লালাস এবং ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচও। লালাস যেমন বলছিলেন, “ও একজন চ্যাম্পিয়ন। আর চ্যাম্পিয়নরা সব সময় সবকিছু জিততে চায়। ও তো ক্যারিয়ারে সবকিছুই জিতেছে, তাই আজকের হারটায় ও হতাশ হবেই। কিন্তু আমার মনে হয়, আজকের ম্যাচের স্কোরলাইন ভুলে আমাদের এখনই আলোচনা করা উচিত ও কতটা আইকনিক, কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কতটা অবিশ্বাস্য এক ফুটবলার।”
পিটার ক্রাউচ আবার স্পেনের বর্তমান দলটার উদাহরণ টেনে অন্য এক সত্য সামনে আনেন, “আজ স্পেনের যে ছেলেরা চ্যাম্পিয়ন হলো, তাদের প্রায় সবাই ছোটবেলায় মেসিকে দেখে বড় হয়েছে, ওর খেলায় অনুপ্রাণিত হয়েছে। এই মানুষটা একটা জিনিয়াস। আর এটাই যদি ওর শেষ বিদায় হয়, তবে মনে রাখতে হবে আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারটিকে বিদায় জানালাম।”
ফাইনালের পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মেসির কান্নার ছবিটা নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। রুপালি মেডেলটা যখন তার গলায় ঝুলছিল, মেসির চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। থিয়েরি অঁরি সেটা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “দেখো, এই হারটা ওর কাছে কী ভীষণ কষ্টের! তোমাদের মনে যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে যে এই বয়সেও ওর জেতার ক্ষুধা আছে কি না, তবে ওর মুখের দিকে তাকাও। দেখো এই কান্না কী অর্থ বহন করে। ও তো জীবনে সব জিতেছে। তাও এই কান্না কেন? কারণ, দেশের প্রতি ওর ভালোবাসা, ওর প্যাশন আর ও নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয় মাঠে।”
এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: রানার্সআপ মেডেল গলায় নিয়ে এই কান্নাই কি আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে মেসির শেষ দৃশ্য? ইব্রাহিমোভিচ চান না মেসির এই রূপকথা এখানেই শেষ হয়ে যাক। জ্লাতান আশা নিয়ে বলেন, “আমি আশা করি ও যত দিন সম্ভব খেলা চালিয়ে যাবে, যাতে আমরা ওকে আরও বেশি উপভোগ করতে পারি। ও কি পরের বিশ্বকাপে থাকবে? আমি জানি না, ফুটবলে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তবে ও খেলছে, এটাই আমাদের আনন্দ। যেদিন ও খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন আমাদের সবার মন খারাপ হবে।”
কিলিয়ান এমবাপ্পে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে মেসির কাছ থেকে একটি রেকর্ড ছিনিয়ে নেন।
Source: ntvbd.com
