ফিফা ও উয়েফার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা
লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন, অভিযোগ করেছেন যে ফিফা ‘ফুটবল শিল্পকে ধ্বংস করছে’। এই দাবি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ২০৩০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তেবাস ইতালির দৈনিক লা গাজেত্তা দেলো স্পোর্ত-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জাতীয় দলের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো মানেই হয় না, কারণ ফুটবল শিল্প শুধু বিশ্বকাপ নয়, ঘরোয়া লিগ ও প্রতিযোগিতাগুলোর ওপরও নির্ভরশীল।
এদিকে, উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন ফিফার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বিশ্বকাপ ফাইনাল বয়কট করেছেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের গভর্নিং বডি উয়েফার মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন চরম রূপ নিয়েছে। গত ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে উপস্থিত থাকলেও, ফিফার একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতি নিজের অনাস্থা তুলে ধরতেই মূলত ফাইনাল ম্যাচ থেকে দূরে থাকার এই সিদ্ধান্ত নেন উয়েফা প্রধান।
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও দ্বিমুখী নীতি
দুই সংস্থার এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় কারণ আমেরিকান স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড স্থগিত করার বিতর্কিত ঘটনা। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। স্বাগতিক দেশের রাজনৈতিক চাপের কাছে ইনফান্তিনো নতি স্বীকার করায় চরম ক্ষুব্ধ হয় উয়েফা। ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির এই সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন, বোধগম্যতাহীন এবং অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে উয়েফা স্পষ্ট জানিয়েছে, ফিফা এবার পরিষ্কারভাবে ‘সীমা লঙ্ঘন’ করেছে।
সংঘাতের কারণ কেবল বালোগানের লাল কার্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় দেশটির কর্তৃপক্ষ, আর ফিফা তাতে নীরব সম্মতি দেয়। এর সরাসরি জবাব হিসেবে উয়েফা আগামী মাসের সুপার কাপ ফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছে সেই আরতানের হাতেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে যাওয়া ইরান ফুটবল দলের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণের ক্ষেত্রেও ফিফা নীরব ভূমিকা পালন করেছে। ইরানি কোচ আমির ঘালেনি আক্ষেপ করে বলেন, বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছে তার দল। এমনকি ইরান টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন আনন্দ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছিলেন।

নতুন নিয়ম ও টিকিটের দাম নিয়ে অসন্তোষ
মাঠের খেলা ও নিয়মের ক্ষেত্রেও দুই সংস্থার দূরত্ব এখন স্পষ্ট। বিশ্বকাপে ফিফার চালু করা নতুন কিছু নিয়ম—যেমন অতিরিক্ত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’, প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় খেলোয়াড়দের মুখ ঢাকার ওপর কার্ড বা ‘ভুল পরিচয়’ সনাক্তকরণসংক্রান্ত ভিএআর প্রোটোকল গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে উয়েফা। উল্লেখ্য, এই বিতর্কিত ভিএআর প্রোটোকলের ভুল প্রয়োগেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ব্রিল এমবোলোকে।
৪৮ দলের বর্ধিত বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এর ফরম্যাট নিয়ে তোপ দেগেছিলেন সেফেরিন। স্লোভেনিয়ার একটি পত্রিকায় তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়:
‘আমাদের এমন অনেক ম্যাচ দেখতে হচ্ছে যা সম্পূর্ণ অরুচিকর ও নিরুত্তাপ।’
পাশাপাশি বিশ্বকাপের টিকিটের আকাশচুম্বী দাম নিয়েও প্রকাশ্যে সোচ্চার ছিলেন উয়েফা প্রধান। ইউকে ও আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৮ ইউরোতে উয়েফা ‘ফ্যান ফার্স্ট’ নীতি বহাল রাখার ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, মোট টিকিটের ৪০ শতাংশের দাম রাখা হবে ৩০ থেকে ৬০ পাউন্ডের মধ্যে এবং কোনো ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে না।
ফিফার বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং দুই প্রধান ফুটবল সংস্থার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে।
Source: bangla.thedailystar.net