বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে নরওয়ে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ডের, যা আর্লিং হালান্ডের জন্য একটি বিশেষ ম্যাচ হতে চলেছে। ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এবং পেশাদার ফুটবল জীবনে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলা এই স্ট্রাইকার তার জন্মভূমির বিপক্ষেই এবার মাঠে নামবেন। এই ম্যাচটিকে তিনি ‘বিশেষ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মিয়ামিতে সংবাদমাধ্যমকে হালান্ড জানিয়েছেন, এটি একটি অত্যন্ত বিশেষ ম্যাচ। তিনি ইংল্যান্ডে খেলেন এবং সেখানেই তার জন্ম। সেখানে তার অনেক সতীর্থও আছেন, তাই ম্যাচটি ভিন্ন ধরনের অনুভূতি দেবে এবং উপভোগ্য হবে।
২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডস শহরে হালান্ডের জন্ম হয়েছিল, যখন তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলছিলেন। ছোটবেলায় পরিবার নিয়ে তিনি নরওয়ের ব্রাইনে শহরে চলে যান, যেখানে তার শৈশব কেটেছে এবং ফুটবলে হাতেখড়ি হয়েছে। স্থানীয় ক্লাব ব্রাইনের হয়ে খেলার সময়ই তার গোল করার সহজাত দক্ষতা সবার নজর কাড়ে। এরপর মলদে, রেড বুল সালৎসবুর্গ, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড পেরিয়ে তিনি ম্যানচেস্টার সিটিতে জায়গা করে নেন। ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জাতীয় দলের জার্সিতে তার পরিচয় নরওয়ের ফুটবলার হিসেবে, কারণ এই দেশেই তার বেড়ে ওঠা এবং ফুটবলার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা। এবার বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে তিনি নিজের জন্মভূমি ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবেন। জন্মের দেশ একপাশে এবং হৃদয়ের দেশ অন্যপাশে—এই দ্বৈত পরিচয় হালান্ডকে আরও অনন্য করে তুলেছে।
ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান?
অন্যদিকে, থমাস টুখেলের অধীনে থাকা ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে পারেনি। প্রতিটি বিশ্বকাপ নতুন আশা নিয়ে শুরু হলেও শেষ হয়েছে হতাশায়। এবার সেই চক্র ভাঙতে চান থমাস টুখেল। জার্মান এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংল্যান্ডের খেলায় নতুন প্রাণ এসেছে। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে দশজন নিয়ে যে লড়াই করে ইংল্যান্ড জয় তুলে নিয়েছে, সেটিকে টুখেল ‘নায়কোচিত পারফরম্যান্স’ বলে বর্ণনা করেছেন।
টুখেল মনে করেন, এই দলের হৃদয় আছে এবং বিশ্বাস আছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা লড়তে জানে। এমন অভিজ্ঞতা একজন কোচ হিসেবে তিনি কখনও ভুলবেন না। তিনি আরও মনে করেন, চাপ সব সময় নেতিবাচক নয়। বড় দল হওয়ার অর্থই হলো চাপ নিয়ে খেলতে শেখা। এই চাপই ইংল্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিশ্বকাপ শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়, বিশ্বকাপের জন্যই তারা বেঁচে থাকেন। এই ট্রফিটাই প্রতিটি ফুটবলারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। চলতি বিশ্বকাপেও কেইন দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, ডেকলান রাইসের নিয়ন্ত্রণ, বুকায়ো সাকার গতি এবং ফিল ফোডেনের কারুকাজ মিলিয়ে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর।
হালান্ড ও বেলিংহামের মুখোমুখি লড়াই
ম্যাচের আরেকটি আবেগঘন গল্প জড়িয়ে আছে হালান্ড এবং জুড বেলিংহামকে ঘিরে। একসময় বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে খেলেছেন এই দুই বন্ধু। মাঠের বাইরে তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে অসংখ্য গল্প আছে। এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ। তাদের বন্ধুত্ব ৯০ মিনিটের জন্য থেমে থাকবে, এরপর আবার ফিরে আসবে। কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি দুর্দান্ত হবে।
ইংল্যান্ড চাইবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। ডেকলান রাইস ও বেলিংহাম ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে নরওয়ের ওপর চাপ বাড়বে। নরওয়ের লক্ষ্য থাকবে দ্রুত বল জিতে ওডেগার্ডের পাসে হালান্ডকে খুঁজে বের করা। সবচেয়ে বড় লড়াই হবে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ বনাম হালান্ড। এক মুহূর্তের অসাবধানতা মানেই গোল। আবার জন স্টোনসরা যদি হালান্ডকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন, তাহলে নরওয়ের আক্রমণ অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। ইংল্যান্ড শিবিরও জানে, এই ম্যাচ সহজ হবে না।
দলের তরুণ মিডফিল্ডার নিকো ও’রাইলি বলেছেন, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের বড় শক্তি। আগের দুই বিশ্বকাপের শিক্ষা এবার কাজে লাগাতে চায় দল। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নায়ক আর খলনায়কের ব্যবধান অনেক সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একটি কর্নার, একটি হেড, একটি দুর্দান্ত সেভ কিংবা একটি ভুল পাস বদলে দিতে পারে কোটি মানুষের ভাগ্যের গল্প।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে খুব কম মানুষই নরওয়েকে শেষ আটে কল্পনা করেছিলেন। ব্রাজিলকে হারিয়ে তারা এই মঞ্চে পৌঁছেছে। সেই জয়কে নরওয়ের কোচ স্টলে সোলবাকেন দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্বকাপে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুধু অংশই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও এসেছে তার দল। রূপকথার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন আর্লিং হালান্ড। চলতি বিশ্বকাপে গোল তার নিত্যসঙ্গী। ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে শেষ আটে তুলেছেন। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও তিনি অন্যতম শীর্ষে আছেন।
ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে আত্মবিশ্বাসী হলেও চাপটা প্রতিপক্ষের কাঁধেই তুলে দিয়েছেন হালান্ড। তার ভাষায়, চাপ সব ইংল্যান্ডের ওপর। সবাই তাদের ফেভারিট বলছে। তারা শুধু তাদের ফুটবল খেলতে চায়। হালান্ডের বিশ্বাস, ভয়হীন ফুটবলই নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। হালান্ড একটি জাতির আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তার ভাইকিং উদযাপন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য। নরওয়ের শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম সবখানেই এখন হালান্ড উন্মাদনা।
তবে নরওয়ের শক্তি শুধু হালান্ড নন। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা, প্যাট্রিক বার্গের বুদ্ধিদীপ্ত মাঝমাঠ, আন্দ্রেয়াস স্কেলদেরুপের গতি, দলটি এখন অনেক বেশি পরিণত। সাবেক ডিফেন্ডার ওডিন বিওরটুফটও মনে করেন, নরওয়ের আসল শক্তি তাদের ঐক্য এবং দলগত ফুটবল। হালান্ড বলেছেন, নরওয়েকে নিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা তার কাছেও বিস্ময়কর। ব্রাজিলকে হারিয়ে এখন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নামা তাদের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
তিনি আরও বলেন, নরওয়েতে মানুষ যেভাবে উদযাপন করছে, তা দেখলে বোঝা যাবে, এটি তাদের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাই সবকিছুই খুব বিশেষ মনে হচ্ছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও ৬০ বছর ধরে কোনো বড় শিরোপা জিততে পারেনি। সেই চাপ ইংল্যান্ডের কাঁধেই তুলে দিতে চান হালান্ড। তিনি বলেছেন, ইংল্যান্ড অবশ্যই শিরোপার অন্যতম দাবিদার। তাই তিনি যতটা সম্ভব চাপ ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের ওপর দিতে চান।
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন হালান্ড। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জয়ের পর ডালাসে কাউবয়ের পোশাক পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা তার ভিডিও ভাইরাল হয়। এ নিয়ে হালান্ড বলেছেন, আমেরিকানদের তিনি খুব পছন্দ করেন। তারা দারুণ মজার মানুষ। এখানে বিশ্বকাপের সবকিছুই অসাধারণ – ম্যাচ, স্টেডিয়াম, অনুশীলনের মাঠ, সবকিছুই তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি সত্যিই খুব আনন্দিত। বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টায় নরওয়ে ও ইংল্যান্ডের মধ্যে এই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।
Source: jugantor.com
