মেসির বাবার মৃত্যুতে শোক, সতীর্থদের পাশে থাকার পরিকল্পনামেসির সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় পারেদেসরা

লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুতে আর্জেন্টাইন ফুটবলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত পরশু তিনি মারা যান। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে মেসি পরিবার নিয়ে রোজারিওর উদ্দেশ্যে রওনা হন। একই দিন রাতে তার বিমান থেকে নামার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এই কঠিন সময়ে মেসির পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন তার জাতীয় দলের সতীর্থ লিয়ান্দ্রো পারেদেস। আর্জেন্টিনার এই মিডফিল্ডার উল্লেখ করেন যে, তিনি এখনও লিওর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি কারণ মেসি তখন ভ্রমণে ছিলেন। পারেদেস জানান, তারা মেসি দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন, যাতে তারা এই কঠিন সময়ে তার পাশে থাকতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সতীর্থদের পাশে পেলে মেসির ভালো লাগবে।

সতীর্থদের পরিকল্পনা ও শোক প্রকাশ

পারেদেস আরও জানান, তারা সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলে আজ অথবা কালের মধ্যে মেসির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ)-এর সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি হোর্হে মেসিকে স্মরণ করে বলেছেন যে, তিনি এমন একজন সন্তান গড়ে তুলেছেন যিনি বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল ও মানুষের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত।

হোর্হে মেসির স্মরণে এএফএ আর্জেন্টিনার সব পর্যায়ের ম্যাচে এক মিনিট নীরবতা পালনের নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়াও, সব খেলোয়াড়, কোচ ও রেফারিদের কালো আর্মব্যান্ড পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এক শোকবার্তায় জানিয়েছে যে, তারা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে লিওনেল ও তার পরিবারের পাশে আছে।

হোর্হে মেসির ছেলেবেলার ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ তাকে মেসির ক্যারিয়ারের নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে স্মরণ করেছে। হোর্হে মেসি ৬৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে মারা গেছেন।

মেসির ক্যারিয়ারে হোর্হে মেসির ভূমিকা

১৩ বছর বয়সে যখন মেসি আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনের বার্সেলোনায় পৌঁছান, তখন তার বাবা হোর্হে মেসির সংগ্রামও কম ছিল না। মেসি পরে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন যে, বার্সেলোনায় আসার পর তিনি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে একা একা কাঁদতেন এবং তার বাবাও একই কাজ করতেন। তারা দুজনই ভালো থাকার অভিনয় করতেন, কিন্তু ভেতর থেকে কষ্ট পাচ্ছিলেন।

ফুটবলের দুনিয়ার কাছে তিনি ছিলেন লিওনেল মেসির বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট। কিন্তু লিওর কাছে তিনি ছিলেন সেই মানুষ যিনি রোজারিও থেকে বার্সেলোনা যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, সব ঝড় একসাথে সামলেছিলেন এবং ইচ্ছে করলেই ফিরে যাওয়ার সহজ পথটা খোলা থাকা সত্ত্বেও ছেলের পাশে থেকে গিয়েছিলেন। ধাতু কারখানার সাবেক শ্রমিক হোর্হে ছিলেন আর্জেন্টিনায় ছেলের প্রথম কোচ। আবান্দেরাদো গ্রান্দোলি নামের যে স্থানীয় ক্লাবে মেসির ফুটবলের হাতেখড়ি, বিশ্ব এই নামটি জানার অনেক আগে থেকেই সেখানে ছিলেন হোর্হে।

২০০০ সালে বার্সেলোনা থেকে যখন ডাক আসে, তখন স্থায়ী চাকরি, স্ত্রী সেলিয়া ও অন্য তিন সন্তানকে রেখে ১৩ বছরের মেসিকে নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমান হোর্হে। শুরুর দিনগুলো ছিল ভীষণ কঠিন। হোর্হে ও লিওনেল ভুগছিলেন একাকীত্বে। একপর্যায়ে হোর্হে ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কি খেলা চালিয়ে যেতে চায় নাকি আর্জেন্টিনায় ফিরে যাবে। মেসি লড়াই চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাই তিনিও তার পাশে থেকে যান।

পরিবারের বাকি সদস্যরা আর্জেন্টিনায় ফিরে গেলেও স্পেনেই থেকে যান হোর্হে। বার্সার একাডেমি লা মাসিয়ায় ছেলেকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করা থেকে শুরু করে দলটিতে মেসির প্রথম পেশাদার চুক্তি সম্পন্ন করার পুরোটা কাজ করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি হন মেসির একমাত্র এজেন্ট ও প্রতিনিধি। বার্সেলোনা থেকে পিএসজি, কিংবা সেখান থেকে ইন্টার মায়ামি— ছেলের ক্যারিয়ারের প্রতিটি মোড়ে তিনি ছিলেন নিবিড়ভাবে যুক্ত।

২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, তার বাবা তাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছেন এবং খেলার ব্যাপারে তিনি বেশ কড়া সমালোচক ছিলেন। এই কারণেই মেসি সব সময় নিজের সীমানা টপকে আরও ভালো করার তাগিদ পেয়েছেন। হোর্হে নিজেকে আড়ালেই রেখেছিলেন, খুব কমই সাক্ষাৎকার দিতেন তিনি।

২০১৩ সালে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ হোর্হে ও মেসির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনে। ২০১৭ সালে কয়েক মিলিয়ন ইউরো জরিমানার বিনিময়ে সে মামলার নিষ্পত্তি ঘটে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে স্পেনে হোর্হে, লিওনেল ও লিও মেসি ফাউন্ডেশন-এর বিরুদ্ধে ওঠা আরও কিছু অভিযোগ ২০২১ সালে খারিজ হয়ে যায়।

হোর্হে তার হাতে গড়া ছেলেটিকে বার্সেলোনার সর্বকালের সেরা এবং ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হতে দেখেছেন, দেখেছেন রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর হাতে তোলার ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ছেলের বছরের পর বছরের যন্ত্রণা ও ব্যর্থতার ট্র্যাজেডিও তিনি সয়েছেন পাশে থেকে। অবশেষে হোর্হে সেই মুহূর্তটিও দেখেছিলেন, যা এই দীর্ঘ যাত্রাকে পূর্ণতা দিয়েছিল। ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে তার ছেলে মেসি পরম আরাধ্য বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।

২০১৩ সালে হোর্হে বলেছিলেন, যেদিন লিও খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন তার মনে হবে তিনি স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠবেন এবং ফুটবল আর দেখবেন না।

বাবা হারালেন মেসি, নিশ্চিত করল পরিবার
বাবা হারালেন মেসি, নিশ্চিত করল পরিবার Credit: bangla.thedailystar.net

রোজারিওর এক কিশোর আর তাকে অনুসরণ করে অজানার পথে পাড়ি দেওয়া এক বাবাকে ঘিরে এই স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল। এর অনেক বছর পেরিয়ে পুরো বিশ্ব দেখেছে কীভাবে সেই কিশোরটি ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের মধ্যে নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোটি কোটি মানুষ লিওনেল মেসির সামর্থ্যে বিশ্বাস রাখার অনেক আগেই, হোর্হে মেসি বিশ্বাস রেখেছিলেন তার ছেলের ওপর।

Source: prothomalo.com

ম স র ব ব র ম ত য ত শ ক, সত র থদ র প শ থ ক র পর কল পন image 2

সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।

By সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।