বিশ্বকাপে মেসির বদলে রদ্রি কেন গোল্ডেন বল জিতলেনকেন মেসির বদলে রদ্রি জিতলেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল?

গোল্ডেন বল বিতর্কের সূত্রপাত

সম্প্রতি সমাপ্ত বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতেছে। এই টুর্নামেন্টে স্পেন অধিনায়ক রদ্রিকে গোল্ডেন বল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে ফুটবল মহলে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ভক্ত এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন, কারণ আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি টুর্নামেন্টে আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করে তার দলকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

রদ্রি, যিনি ম্যানচেস্টার সিটির একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, টুর্নামেন্টের আটটি ম্যাচেই খেলেছেন কিন্তু কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। তার এই পুরস্কার জয় অনেককে ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের সময়কার বিতর্ক মনে করিয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, একজন মিডফিল্ডার কীভাবে গোল বা অ্যাসিস্ট না করেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন, বিশেষ করে যখন মেসির মতো খেলোয়াড় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন।

ফিফার এই সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সংস্থা (আইএফএফএইচএস) লিওনেল মেসিকেই টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি তাদের নিজস্ব ডেটা-পারফরম্যান্স সূচক বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গোল্ডেন বল নির্বাচনের মানদণ্ড

ফিফাগোল্ডেন বল পুরস্কারের নির্বাচন প্রক্রিয়া গোল্ডেন বুট থেকে ভিন্ন। গোল্ডেন বুট কেবল সর্বোচ্চ গোলের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। তবে গোল্ডেন বল বিজয়ী নির্বাচিত হন ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ (টিএসজি) এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে। এই পুরস্কারটি ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে প্রথম ইতালির স্ট্রাইকার পাওলো রসি পেয়েছিলেন। এখানে কেবল পরিসংখ্যানের চেয়ে বিচারকদের সার্বিক মূল্যায়নের গুরুত্ব বেশি।

গোল্ডেন বল বিজয়ী বাছাইয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেল শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখে না। তারা একজন খেলোয়াড়ের ট্যাকটিক্যাল প্রভাব, পুরো টুর্নামেন্টে তার ধারাবাহিকতা, টেকনিক ও শারীরিক সামর্থ্য, নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো মূল্যায়ন করে। এছাড়াও, পাসের নির্ভুল হার, রক্ষণ সামলাতে অবদান, বল পুনরুদ্ধার, ড্রিবলিংয়ের সাফল্য এবং ওয়ার্ক রেটের মতো আধুনিক সূচকগুলোও ফিফা বিশ্লেষণ করে।

এই মানদণ্ডগুলো বিবেচনা করলে রদ্রির সার্বিক পারফরম্যান্স এবং স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়। রদ্রি এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার বল ছুঁয়েছেন (৯১০ বার) এবং সবচেয়ে বেশি সফল পাস দিয়েছেন (৭৫৬টি)। তার পাসের নির্ভুলতার হার ছিল ৯৩.২ শতাংশ।

তিনি আক্রমণভাগের শেষ অংশে (ফাইনাল থার্ডে) টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ২০৪টি পাস দিয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায় স্পেনের প্রতিটি আক্রমণ তাকে ঘিরেই গড়ে উঠত। ডিফেন্সিভ পজিশনে খেলে সুযোগ তৈরির দিক থেকে তিনি ১৫তম স্থানে ছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে তিনি খেলা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি আক্রমণভাগেও সমান কার্যকর ছিলেন।

যখন বল প্রতিপক্ষের পায়ে থাকত, রদ্রি তখনও সমান প্রভাব বিস্তারকারী ছিলেন। তিনি টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২৬টি ট্যাকল করেছেন এবং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার দিক থেকে (মিডল ও অ্যাটাকিং থার্ডে) সেরা চার খেলোয়াড়ের একজন ছিলেন। এই পরিসংখ্যানগুলো রদ্রির খেলার একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরে। তিনি স্পেনের মাঝমাঠের প্রাণ ছিলেন এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কারণেই ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমোর মতো আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডাররা স্বাধীনভাবে খেলতে পেরেছেন।

রদ্রির পজিশনাল ডিসিপ্লিনের কারণে পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের দলগত পারফরম্যান্স ছিল সুসংগঠিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। পুরো আসরে স্পেন বল দখলে আধিপত্য দেখিয়েছে এবং আট ম্যাচের সাতটিতেই জাল অক্ষত রেখে মাত্র একটি গোল খেয়েছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। স্পেনের প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রদ্রি, যদিও তিনি কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট পাননি। এই কারণেই ফিফার টেকনিক্যাল প্যানেল এবং সাংবাদিকরা তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

আর্জেন্টিনাকে বিশেষ বার্তা ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর
আর্জেন্টিনাকে বিশেষ বার্তা ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর Credit: jugantor.com

মেসি বনাম রদ্রি: ভিন্ন মূল্যায়ন

আর্জেন্টিনা দলে মেসির প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশ্বকাপে তাদের ১৯টি গোলের ১২টিতেই তার অবদান ছিল। তিনি বেশ কয়েকটি ম্যাচ একাই জিতিয়েছেন। আইএফএফএইচএস তাদের নিজস্ব পারফরম্যান্স ইনডেক্সের ওপর ভিত্তি করে মেসিকে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই পদ্ধতিতে গোল, অ্যাসিস্ট, প্রতিটি ম্যাচের রেটিং এবং নকআউট পর্বের প্রভাব সুনির্দিষ্ট সমীকরণের মাধ্যমে হিসাব করা হয়। আইএফএফএইচএস জানিয়েছে, মেসি টুর্নামেন্টে আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন, যার গড় ম্যাচ রেটিং ছিল ৮.৩৩।

সংস্থাটি মেসির নকআউট পর্বের পারফরম্যান্সকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে তিনি দলকে বিদায়ের শঙ্কা থেকে টেনে তোলার ক্ষমতা দেখিয়েছেন। আইএফএফএইচএস স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে তাদের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত পরিচিতি বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং শতভাগ তথ্য-উপাত্ত এবং পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে ১০টি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে একটি দারুণ আসর কাটিয়েছেন। ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম সাতটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিবেচনা করে অনেকেই মনে করেন মেসির প্রভাব বেশি ছিল, কারণ তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন।

গোল্ডেন বল নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে কারণ গোল্ডেন বুটের মতো এখানে কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। একদল সবসময় গোলদাতা এবং ম্যাচ উইনারদের গুরুত্ব দেন, অন্যদিকে অন্য দলের মতে, খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, ছন্দ তৈরি করা এবং পুরো দলকে একসঙ্গে সচল রাখাও কম মূল্যবান নয়। এই বিশ্বকাপফিফার স্বীকৃত ভোটাররা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন।

মেসিকেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা
মেসিকেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা Credit: jugantor.com

রদ্রি কি সত্যিই ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, নাকি কেবল চ্যাম্পিয়ন দলের সেরা খেলোয়াড়— এই তর্ক স্পেনের উৎসব শেষ হওয়ার পরেও দীর্ঘ দিন চলবে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি এই আসরে কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। বিপরীতে, রদ্রি স্পেনকে দিয়েছেন ছন্দ ও কার্যকারিতা। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন ভূমিকাকে বেশি মূল্যায়ন করেছেন, গোল্ডেন বল তারই রায়।

Source: bangla.thedailystar.net

ব শ বক প ম স র বদল রদ র ক ন গ ল ড ন বল জ তল ন image 3

সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।

By সাকিব রহমান

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা ক্রীড়া প্রতিবেদক।