ভিএআর-এর দীর্ঘ অপেক্ষা
বোস্টন স্টেডিয়ামে ফ্রান্স বনাম মরক্কো বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের একটি নাটকীয় মুহূর্তে কিলিয়ান এমবাপে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন। এই ঘটনায় পেনাল্টি মিসের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিদ্ধান্তের জন্য অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় এবং দুই আর্জেন্টাইন ম্যাচ অফিসিয়ালের ভূমিকা।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ দিকে নুসাইর মাজরাউই বক্সের ভিতরে এমবাপেকে ফাউল করলে আর্জেন্টাইন রেফারি ফাকুন্ডো তেলো সঙ্গে সঙ্গেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান। তবে এরপরই শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। ভিএআর হার্নান মাস্ত্রাঞ্জেলো, যিনিও আর্জেন্টিনার, ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তেলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এমবাপে পেনাল্টি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু ভিএআর চেক শেষ হওয়ার জন্য তাঁকে ৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়।

অবশেষে পেনাল্টির অনুমতি মিলতেই এমবাপে শট নেন। তিনি ডানদিকে বল মারলেও মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু দারুণ দক্ষতায় তা প্রতিহত করেন, ফলে ফ্রান্সের একটি সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ অপেক্ষা এমবাপের মানসিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছিল কিনা, তা নিয়ে ফুটবল মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী ভিএআর যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত পেনাল্টি নেওয়া সম্ভব নয়।
ভিএআর এবং রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভিএআর নিয়ে এটি আরেকটি বিতর্কিত মুহূর্ত। এর আগে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচেও ভিএআর-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার পর ফিফা রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ভিএআর-এর প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে এবং ম্যাচ অফিসিয়ালদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই।
তবে বোস্টনে এমবাপের পেনাল্টির আগে তিন মিনিটেরও বেশি সময় ধরে ভিএআর পর্যালোচনা হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এত দীর্ঘ বিলম্ব কি একজন পেনাল্টি নেওয়া ফুটবলারের মানসিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে? এই ঘটনা রেফারিং এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ফ্রান্স ও মরক্কোর পরিসংখ্যান
ফ্রান্স এবং মরক্কো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল। ফ্রান্স ইতিহাস, অভিজ্ঞতা এবং কিলিয়ান এমবাপের মতো তারকায় সমৃদ্ধ। অন্যদিকে, মরক্কো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক উন্নতিতে আফ্রিকান ফুটবলের নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। মরক্কো টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছে।
এখন পর্যন্ত ছয়বার মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স ও মরক্কো। এর মধ্যে চারটিতে জিতেছে ফ্রান্স, বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। মরক্কো এখনও ফ্রান্সকে হারাতে পারেনি। বিশ্বকাপে দুই দলের একমাত্র দেখায় ২০২২ আসরের সেমিফাইনালে ফ্রান্স ২-০ গোলে জিতেছিল। সেই ম্যাচেও ফরাসি কোচ ছিলেন দিদিয়ের দেশম। ওই ম্যাচে গোল করেছিলেন থিও হার্নান্দেজ, যিনি এবারও দলে আছেন।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আফ্রিকার দলের বিপক্ষে ফ্রান্সের শতভাগ জয়ের রেকর্ড রয়েছে। ২০১৪ সালে নাইজেরিয়াকে এবং ২০২২ সালে মরক্কোকে, দুই ম্যাচেই ২-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের রেকর্ড ৮ ম্যাচে ৬ জয় ও ২ হার। তাদের একমাত্র দুটি হার এসেছে ১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে।
খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মাইলফলক
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শেষ ১৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচের ১৪টিতেই জিতেছে ফ্রান্স (১ ড্র, ১ হার)। আর বিশ্বকাপে শেষ ১৯ ম্যাচে তাদের জয় ১৬টি (২ ড্র, ১ হার)। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শেষ ২১ ম্যাচের ১৮টিতেই জয় পেয়েছে ফরাসিরা। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপের গোলটি ছিল বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ১৫০তম গোল। ব্রাজিল, জার্মানি ও আর্জেন্টিনার পর চতুর্থ দল হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছে ফ্রান্স।
বিশ্বকাপে শেষ ছয় ম্যাচে ১০ গোল করেছেন এমবাপে। টুর্নামেন্টে মোট ১৯ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ১৯। মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি ২০২১ সাল থেকে পিএসজির খেলোয়াড়। তার ক্লাব সতীর্থ ফ্রান্স দলে আছেন পাঁচজন – ওসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলা, ওয়ারেন জায়ির-এমেরি, দেজিরে দুয়ে এবং লুকাস হার্নান্দেজ। মরক্কো দলে আরও চারজন খেলোয়াড় বর্তমানে ফরাসি লিগ ওয়ানের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন – আয়ুব বুয়াদ্দি (লিল), আমিন সবাই (অ্যাঞ্জে), সামির এল মুরাবেত ও গেসিম ইয়াসিন (দুজনই স্ট্রাসবুর্গ)।
বিশ্বকাপে ইউরোপের দলের বিপক্ষে শেষ ৯ ম্যাচে মাত্র ২টিতে হেরেছে মরক্কো (৩ জয়, ৪ ড্র)। বিশ্বকাপে শেষ ১৩ ম্যাচে মরক্কোর হার মাত্র দুটি (৬ জয়, ৫ ড্র)। টানা দুই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রথম আফ্রিকান দেশ মরক্কো। এটি মরক্কোর ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল। ২০২২ সালে তারা পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার শেষ চারে উঠেছিল। বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করেছে মরক্কো, যা তাদের ইতিহাসে দীর্ঘতম গোল করার ধারাবাহিকতা। এবারের বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ১০ গোল করেছে মরক্কো। সেনেগালের (২০২৬) পর দ্বিতীয় আফ্রিকান দল হিসেবে এক আসরে ১০ বা তার বেশি গোল করার কীর্তি গড়েছে তারা।
Source: bengali.indianexpress.com
