ই-পেপার

শেবাচিমে রোষ্টার বানিজ্য: একই স্থানে বছর পার কর্মচারীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের রোষ্টার পরিবর্তনের নিয়ম বেধে দিয়েছেন পরিচালক। তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর কর্মচারীদের রোষ্টার পরিরবর্তন করতে হবে। কাজের স্বচ্ছতা এবং অনিয়ম রোধে এমন নিয়ম করা হলেও পরিচালকের সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। কতিপয় ওয়ার্ড মাস্টার এবং কর্মচারী নেতাদের রোষ্টার বানিজ্যের কারণে একই স্থানে মাসের পর মাস থেকে যাচ্ছেন কর্মচারীরা। এ নিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করলেও নিশ্চুপ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, ‘এ হাসপাতালে রোষ্টার নিয়ে অনিয়ম দীর্ঘ দিনের। প্রতি মাসে কর্মচারীদের রোষ্টার হলেও কাজের স্থান পরিবর্তন হচ্ছে না। একই স্থানে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এক শ্রেণির কর্মচারীরা। বিনিময়ে ওই কর্মচারীদের পাশাপাশি লাভবান হচ্ছেন কতিপয় ওয়ার্ড মাস্টার এবং কর্মচারী নেতারা।

সূত্রগুলো আরও জানায়, হাসপাতালে সরকারি বেতনের বাইরে অবৈধভাবে উপার্জনের বহু জায়গা রয়েছে। যেখান থেকে অবৈধ উপায়ে প্রতি মাসে বেতনের থেকে দ্বিগুন অর্থ উপার্জন করে থাকেন কর্মচারীরা। বিশেষ করে হাসপাতালের বহিঃর্বিভাগ গুলোতে এ অনিয়ম এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ‘বহিঃবিভাগে চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন তারা বহিরাগত ডায়াগনস্টিক থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা কমিশন পেয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, বহিঃবিভাগে দায়িত্বরত এমএলএসএস’রা একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এবং শেয়ার। যে কারণে হাসপাতালে আসা রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছেন নিজস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক লাভবান ছাড়াও ব্যক্তিগত ভাবে প্রতি হাজারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকেন কর্মচারীরা। এমন অনিয়ম শুধু আউটডোর গুলোতেই নয়, বরং ওয়ার্ডে কর্মরত কর্মচারীরাও জড়িত অনিয়মের সাথে।

সূত্র জানায়, আন্তঃবিভাগে গাইনী এবং প্রসুতী ওয়ার্ড, মহিলা সার্জনারী, মহিলা মেডিসিন, পুরুষ সার্জারী, অর্থপেডিক্স, পথ্য বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং অপারেশন থিয়েটারে রোষ্টার নেয়ার জন্য সরকারি কর্মচারীরা মাসহারা দিয়ে থাকেন ওয়ার্ড মাস্টারদের। কেননা এসব বিভাগে রোগীর চাপ বেশি থাকায় অবৈধ উপার্জনও বেশি থাকে। এসব ওয়ার্ডে কর্মরত এক একজন কর্মচারী প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ পথে উপার্জনে সক্ষম বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে, দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা এমন অনিয়ম ধরা পরে বর্তমান পরিচালকের চোখে। তাই এ হাসপাতালে পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর পরই রোষ্টারে করাকরি করেন তিনি। প্রতিজন কর্মচারী একই স্থানে তিন মাসের বেশি সময় থাকতে পারবেন না বলে চিঠি আকারে নির্দেশ প্রদান করেন তিনি।

হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘ডা. এইচ.এম সাইফুল ইসলাম কর্মস্থলে যোগদানের পরে গত ১৭ মে একটি আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, ‘পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেবাচিম হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের ডিউটি রোষ্টার ওয়ার্ড মাষ্টারদের শর্ত সাপেক্ষে প্রস্তুত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হল। শর্তানুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর রোটেশন অনুযায়ী রোষ্টার পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) এবং প্রশাসনিক শাখা এ রোষ্টার মনিটরিং করবে। সাথে সাথে ইতোপূর্বে জারীকৃত চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের রোষ্টার কমিটি বাতিল করা হয় ওই আদেশের মাধ্যমে।

কর্মচারীরা বলেন, ‘নতুন পরিচালক যোগদান করে পুর্বের রোষ্টার কমিটি বাতিল করলেও বর্তমানে সেই বাতিল কমিটির লোকজনই এখন অঘোষিতভাবে রোষ্টার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে একজন কর্মচারী মাসের পর মাস দায়িত্ব পালন করছেন একই স্থানে।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কর্মচারী নেতা লিখন, মনিরুজ্জামান, ইউসুফ হাওলাদার, নাসিমা বেগম, সঞ্জয়, সাইফুল ইসলাম ও আবু বক্কর সহ একাধিক এমএলএসএস রয়েছেন যারা সর্বনিম্ন ৬ থেকে এক বছরের অধিক সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন মেডিসিন, গাইনি, সার্জারী এবং ইএনটি বহিঃর্বিভাগে। এছাড়া জরুরি বিভাগে শেষ কবে রোষ্টার পরিবর্তন হয়েছে সে নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ.এম সাইফুল ইসলাম কে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে রোষ্টার মনিটরিং এর দায়িত্ব থাকা সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মনিরুজ্জামান শাহীন বলেন, ‘অনিয়ম দূর করতেই আমরা তিন মাস অন্তর রোটেশন অনুযায়ী রোষ্টার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এজন্য ওয়ার্ড মাষ্টারদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা রোষ্টার তৈরি করে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। তাদের মুখের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করেই আমরা রোষ্টার অনুমোদন দিয়ে থাকি। কেননা অনেক কর্মচারী, তাদের একজন একজন খোঁজ করা সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি সু-স্পষ্টভাবে ধরিয়ে দিতে পারলে অবশ্যই আমরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এ ক্ষেত্রে ওয়ার্ড মাষ্টারদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেলে সেটারও ব্যবস্থা হবে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন