ই-পেপার

প্রতিক্ষার পায়রা সেতু’র দ্বার উন্মোচনের অপেক্ষা

খান রুবেল | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১

পটুয়াখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী কুয়াকাটা। যেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় সূর্যাস্ত এবং সূর্যদয়ের অপরূপ দৃশ্য। যা উপভোগ করতে দেশ বিদেশের লাখ লাখ পর্যটক আসছেন কুয়াকাটায়। বরিশাল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই পথে পর্যটকদের ভোগান্তি শুধু লেবুখালী ফেরী। তাও দূর হতে যাচ্ছে চলতি বছরেই।

কেননা বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কের মধ্যবর্তী লেবুখালীতে অবস্থিত দৃষ্টি নন্দন পায়রা সেতুর কাজ এখন শেষ পর্যায়। পরীক্ষামূলকভাবে জ্বলে উঠেছে পায়রা সেতুর আলো। আরমাত্র পাঁচভাগ কাজ সম্পন্ন হলেই সেপ্টেম্বর মাসে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে দ্বিতীয় কর্ণফুলী সেতুর আদলে নির্মিত ফোর লেন বিশিষ্ট পায়রা সেতু।

বহু কাঙ্খিত এই সেতুর দ্বার উন্মোচনের মধ্যে দিয়ে কুয়াকাটার সাথে বরিশাল ও রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হবে। ঘুচে যাবে ফেরি পারাপারের চিরাচরিত দুর্ভোগ। সেই সাথে সেতুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনার দ্বার আরও খুলে যাবে বলে। এমনকি পায়রা ব্রিজ এবং পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে এই অঞ্চলে অর্থনীতিতে আরও সমৃদ্ধি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণ করে পায়রা সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পায় চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লং জিয়াং রোড অ্যান্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন নামক প্রতিষ্ঠান। কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট, ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ বিনিয়োগে ‘কর্ণফুলী সেতু’র আদলে দেশে দ্বিতীয় বারের মতো নির্মিত হচ্ছে ‘এক্সট্রা ডোজ প্রি-স্ট্রেসড বক্স গার্ডার’ টাইপের এই সেতু। যার নির্মাণ ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ৪৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘নানা কারণে কয়েক দফায় সেতুর নির্মাণ ব্যয় এবং তিন দফা সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নির্ধারিত সময়ে ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেনি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নানা প্রতিকূলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছরেরও অধিক সময় গেলে যাচ্ছে সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে।

পায়রা সেতুর প্রকল্প পরিচালক আবদুল হালিম বলেন, ‘নদীর মূল অংশের ৬৩০ মিটার ‘বক্স গার্ডার’ চারটি স্প্যানের ওপর নির্মিত হয়েছে দ্বিতীয় কর্ণফুলী সেতুর আদলে নির্মিত পায়রা সেতু। যার মূল অংশ ২০০ মিটার করে দুটি স্প্যান ১৮ দশমিক ৩০ মিটার ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দরের উপকূলীয় পণ্য ও জ্বালানিবাহী নৌযান চলাচলের জন্য।

তিনি বলেন, ‘মূল সেতুটি বিভিন্ন মাপের ৫৫টি টেস্ট পাইল সহ ১০টি পিয়ার, পাইল ও পিয়ার ক্যাপের ওপর নির্মিত হয়েছে। এছাড়া সেতুতে রয়েছে ১৬৭টি বক্স গার্ডার সেগমেন্ট। যার ফলে দূর থেকে দলখে মনে হবে সেতুটি ঝুলে আছে। তাছাড়া জোয়ারের সময় নদী থেকে সেতু ১৮ দশমিক ৩০ মিটার উঁচু থাকবে। এতে নদীতে বড় বড় জাহাজ চলাচলেও কোন সমস্যা হবে না।

প্রকল্প পরিচালক আবদুল হালিম আরও বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ এখন শেষ পর্যায়। বলতে গেলে ৯৯ ভাগ কাজই শেষ। এখন ফিনিসিংয়ের পাশাপাশি খরস্রোতা পায়রা নদীর ভাঙন থেকে লেবুখালী সেতু রক্ষায় পটুয়াখালী প্রান্তে এক হাজার ৪৭৫ মিটার নদী শাসনের কাজ চলছে। সেতুর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বরিশাল প্রান্তেও নদী শাসনের প্রয়োজন রয়েছে।

তাছাড়া প্রকল্পের আওতায় বরিশালে একটি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। টোল আদায়ে পটুয়াখালী প্রান্তে নির্মাণ হচ্ছে টোল প্লাজা। ডিজিটাল পদ্ধতিতে এ সেতুর টোল আদায় করা হবে এবং সৌর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হবে পায়রা সেতু।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘সেতুতে আলোকসজ্জার কাজ শেষ হয়েছে। সৌর বিদ্যতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরি মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সেতুর সকল বাতিগুলো জালানো হয়েছে। এসময় দূর থেকে সেতুটি দেখতে বেশ দৃষ্টনন্দন লেগেছে। তাছাড়া ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই দূর দূরত্ব থেকে অসংখ্য মানুষ আসছে পায়রা সেতুর সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

বরিশাল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির হোসেন বলেন, ‘এটি দক্ষিণাঞ্চলবাসীর স্বপ্নের পায়রা সেতু। অসংখ্য মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে এই সেতুকে ঘিরে। সেতুটির দ্বার উন্মোচন হলে পদ্মার এবারের ১১ জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হবে। আর পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচন হলে পর্যটন শিল্পের আরও প্রসার ঘটবে বলেও মনে করেন এই সাংবাদিক নেতা।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন