ই-পেপার

র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমনের বিয়ে সম্পন্ন

বিএসএল নিউজ ডেস্ক | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২১

র‌্যাবের গুলিতে এক পা হারানো ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের সেই লিমন হোসেন বিয়ে করেছেন। কনে যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার নওপাড়া এলাকার রাবেয়া বসরী। যশোরে কনে বাড়িতেই শুক্রবার দুপুরে তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে লিমনের গ্রামের বাড়িতে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিমনের পরিবার, সহপাঠী ও আত্মীয় স্বজনরা অংশ নেন।

লিমন হোসেন জানান, পরিবারের ইচ্ছায় বাবা-মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে এবার জীবনে আরেকধাপ এগিয়ে যেতে চান তিনি। লিমনের স্ত্রী রাবেয়া বসরী জানান, লিমন নিজের সাথে যুদ্ধ করে ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন, দাম্পত্য জীবনেও তিনি দায়িত্বশীল হবেন। এটা বুঝেই আমি এ বিয়েতে রাজি হয়েছি।

জানা গেছে, ২০১১ সালে ১৭ বছরের কিশোর লিমন ‍এর বয়স ‍এখন ২৭ বছরের যুবক। তাকে গুলি করার ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় র‌্যাবের অভিযান। ঝালকাঠির সাতুরিয়া গ্রামের পা হারানো সেই কিশোর এখন সাভার গণবিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের সহকারী প্রভাষক। বিয়ে করে এখন তিনি সংসার জীবন শুরু করতে যাচ্ছেন।

প্রসংগত, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে বাড়ির কাছের মাঠে গরু আনতে গিয়ে হতদরিদ্র কলেজছাত্র লিমন হোসেন র‌্যাবের গুলিতে আহত হয়। গুলিবিদ্ধ লিমনকে সন্ত্রাসী সাজিয়ে র‌্যাবের ডিএডি লুৎফর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। তৎকালীন কলেজ ছাত্র লিমন হোসেন ও স্থানীয় সন্ত্রাসী মোরসেদ জমাদ্দার এবং তার সহযোগীসহ আট জনকে আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করেন।

একটি অস্ত্র এবং অপরটি সরকারিকাজে বাধা দানের অভিযোগে মামলা। গুরুতর আহত লিমনকে ভর্তি করা হয় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। যথাযত চিকিৎসার অভাবে ২০১১ সালের ২৭ মার্চ লিমনের বাম পা হাটু থেকে কেটে ফেলা হয়। চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় লিমন হোসেন।

এ ঘটনায় লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে বরিশাল র‌্যাব-৮ এর ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে ছেলে লিমনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নুসরাত জাহানের আদালতে একটি নালিশী মামলা দায়ের করেন। আদালতের নিদেশের ১৬ দিন পর ২৬ এপ্রিল ২০১১ রাজাপুর থানায় র‌্যাবের ডিএডি লুৎফর রহমানসহ ছজনের নামে মামলাটি লিপিবদ্ধ করা হয়।

অন্য আসামিরা হলেন কর্পোরাল মাজহারুল ইসলাম, কনস্টেবল আবদুল আজিজ, নায়েক মুক্তাদির হোসেন, সৈনিক শ্রী প্রহল্লাদ চন্দ্র এবং সৈনিক কার্তিক কুমার বিশ্বাস। পুলিশ লিমন হত্যাচেষ্টা মামলায় ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট র‌্যাব সদস্যদের নির্দোষ উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

লিমনের মা হেনোয়রা বেগম পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে ২০১২ সালের ৩০ আগস্ট নারাজী দাখিল করেন। দীর্ঘ শুনানী শেষে ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নারাজী আবেদন খারিজ করে দেন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. শাহীদুল ইসলাম। এ আদেশের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন লিমনের মা।

২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচজন জেলা ও দায়রা জজ ২৬ বার রিভিশনের শুনানী গ্রহণ করেন এবং কোন আদেশ না দিয়ে অধিকতর শুনানীর জন্য অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করেন। ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ১৬ বার শুনানী অনুষ্ঠিত হয়।

২০১৮ সালের ১ এপ্রিল ৪২তম শুনানী শেষে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এস কে এম তোফায়েল হাসান র‌্যাবের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। রিভিশন মঞ্জুর হওয়ায় লিমন হত্যাচেষ্টায় র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। মামলা নথি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাওয়ার পর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মো. সেলিম হাসান লিমন হত্যাচেষ্টা মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।

আদেশে উল্লেখ করা হয় কমপক্ষে সহকারী পুলিশ সুপার মর্যাদার একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা দিয়ে মামলার তদন্ত করাতে হবে। এ আদেশ নিয়ে নানা জটিলতার পর ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআইর (হেডকোয়াটার) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং কয়েকজন সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলেন। অপর দিকে লিমনসহ আট জনের বিরুদ্ধে র‌্যাব অস্ত্র আইনে এবং সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে যে দুটি মামলা দায়ের করেছিল ওই মামলা থেকে সরকার লিমনের নাম প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০১৩ সালের ১০ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব মো. মিজানুর রহমান ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক এবং পাবলিক প্রসিকিউটরকে লিমনের নাম মামলা থেকে প্রত্যাহের জন্য আদেশ জারি করেন। এ আদেশ ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ঝালকাঠি জেলা জজ ও মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে প্রেরণ করা হয়।

আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আব্দুল মান্নান রসুলের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঝালকাঠির বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ২ এর বিচারক কিরণ শঙ্কর হালদার ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই অস্ত্র মামলার দায় থেকে লিমন হোসেনকে অব্যহতির আদেশ দেন। ঝালকাঠির মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. আবু শামীম আজাদ সরকারের একই সিদ্ধান্তে সরকারি কাজে বাধা দানের মামলা থেকে লিমনকে অব্যহতি দেন ২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর।

অপরদিকে যে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোরসেদ জমাদ্দারকে ধরতে গিয়ে লিমনকে গুলি করেছিল র‌্যাব সেই মোরসেদ জমাদ্দারসহ অপর সাত আসামি র‌্যাবের দায়ের করা অস্ত্র মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৪ আদালত থেকে ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এবং সরকারি কাজে বাধা দানের মামলায় মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত থেকে ২৯ মার্চ বেকসুর খালাশ যায়। রিভিশনের শুনানীতে লিমনের মায়ের আইনজীবীরা এ বিষয়টি আদালতে তুলে ধরেন।

এদিকে গুলিবিদ্ধ লিমনের একটি পা কেটে ফেলার পরে ২০১১ সালের ৯ মে হাইকোর্ট লিমনের জামিন মঞ্জুর করে। লিমন জামিনে মুক্ত হওয়ার পর লিমনের উন্নত চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষ লিমনকে আর্থিক সাহায়তা করে। ঢাকার সাভারের সিডিডি নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লিমনকে একটি কৃত্রিম পা সংযোজন করে দেয়। এই নকল পায়ে ভর করে লেখা পড়া করে ২০১৩ সালে লিমন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে।

একই বছর লিমন ডা. জাফরউল্লাহর সহযোগিতায় সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে এলএল.বি অনার্সে ভর্তি হন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে লিমন এলএল.বি অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম ডিগ্রি নিয়ে ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাভার গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষা সহকারী পদে যোগ দেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সহকারী প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি হয় লিমনের। পা হারানোর সেই দুর্বিষহ দিন পেরিয়ে ছেলের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুদ্ধে গর্বিত লিমনের বাবা-মা। ছেলের বিয়ে নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত তাঁরা।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন