ই-পেপার

শওকত হোসেন হিরন অপরাজিতার মতই আলো ছড়িয়েছেন বরিশালে

হেনরী স্বপন | আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০২১

মেয়র শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুদিন আজ! দিনটি হতে পারত, বরিশালবাসীর জন্য আনন্দ-বেদনার দ্বি-মিশ্রিত অভিজ্ঞতায় রঙিন গোধূলির মতন সুন্দর। আজ আমাদের কাছে, মানুষ হিসেবে শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুমুহুর্তের ট্রাজেডিগুলো যেমন মনে আছে…তেমনি মেয়র হিসাবে প্রতিনিয়ত তাঁর এই শহর আইকন করে গড়ে তোলার স্বপ্নের সঙ্গে আমরাও জড়িত আছি।

তাই শুধু মৃত্যুরই নয়-আমরা যেনো বেঁচে থাকারও ক্রীতদাস। এ কারণেই বিবেকানন্দ মানুষের আত্মশক্তি জাগ্রত করার জন্য গভীর প্রত্যয়ে বলতেন, ‘জন্মেছিস যখন একটা দাগ রেখে যা…।’ জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে এই দাগ-ই স্রোতের বাইরে কোনও মানুষকে আলাদাভাবে চিহ্নিত হওয়ার স্মারক করে তোলে।

অতএব, স্বতন্ত্র অবদানের মাধ্যমে যারা এই ‘দাগ’ রেখে যেতে পেরেছেন, তারাই দেশ ও সময়ের আবহমান জীবনধারায় অনন্য এই একেকজন কখনো কখনো প্রতিকীমানুষ রূপে চিহ্নিত হয়ে যান। তাই তো, অসময়োচিত শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পর বরিশালবাসী প্রতিনিয়ত এই মানুষটিকে স্মরণ করছেন না কী?

তাহলে, আমরা আজ তার সমস্ত কৃতিত্বের জন্য যদি স্মরণীয়দের তালিকায় মেয়র শওকত হোসেন হিরনের নাম সংযোজিত করতে চাই, তাতে কেউ কি খুব আপত্তি করবেন? হয়তো অনেকেই করবেন না, কিন্তু কেউ কেউ সেটা করবেনও বটে। অবশ্য তাদের আপত্তির কারণগুলিও হয়তো বিনা দ্বিধায় উপেক্ষা করার মতোনও নয়।

কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই শওকত হোসেন হিরন যখন এরশাদের জাতীয় পার্টির মাধ্যমে রাজনীতি জীবন শুরু করেছিলেন; জীবন-যাপনের সেই স্তর থেকে উঠে এসে সে তখন পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত ছিলেন না। তবুও রাজনৈতিক অঙ্গনের সেইখানেই নিজেকে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তারপর, তাঁর এই জীবন আরও বিস্তৃত হয়েছে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর মাধ্যমে, আওয়ামী রাজনীতির বৃহৎ পরিসরে এসে এবং তখন থেকেই সে কেবল তার নিবেদিত নেতৃত্বের মাধ্যমে, আমাদের প্রাণের শহর বরিশালের মেয়র নির্বাচিত হয়ে, বহু চড়াই-উৎরাই পেড়িয়ে নিরলস কাজ করে গেছেন।

তাই, তার এই অভিযাত্রার ইতিহাস সর্ব-অর্থেই দুঃশ্চর ছিল? কিন্তু তাও তিনি অপরাজিতার মতোই নীল-সাদা-বেগুনী হয়েই ফুটেছেন। যে অপরাজিতায় তিনি একই সঙ্গে অধিকজনের কাছে অভিনন্দিত ও কিছু নিন্দুকের কাছে সমালোচিতও ছিলেন।

তবে, বরিশালেরর মেয়র নির্বাচিত হলে, তাঁর অজস্র উন্নয়ন কাজের গতির পাশে, ছায়ার মতো আজও আমাদের কাঙ্খিত রয়েছে-‘বরিশাল মডেল’ গড়ে তোলার সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন। যদিও দ্বিতীয় পর্যায়ে বরিশালবাসী তাকে নির্বাচিত করেননি। সেটিই হয়তো আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের অন্ধকার-আতঙ্ক।

কেননা, আমাদের সেই ভুলের চারপাশে আজ অনেক ফুলের বাগান আর পথের পাশের সবুজ বেষ্টিত গাছগুলি মরে যাচ্ছে। ফুল ও ফলের বাগানগুলো সঠিক পরিচর্যার অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার পুকুর সংরক্ষণের মাধ্যমে যে ওয়ার্কিংওয়ে তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোও ধ্বংসের শেষ পর্যায় এসে প্রাতঃভ্রমণের লোকগুলো সান্ধ্যভ্রমণের হাঁটায় হোঁচট খেয়ে পড়ছে।

তাই, আমরা যে প্রশস্থ রাস্তাঘাট-পার্ক-পথের পাশের বাগানে সজ্জিত-এই আইকন শহরের এতো সব সৌন্দর্যের মাঝে দু’দণ্ড দাঁড়ালেই, বরিশালের যে বনলতার অপরূপ-রূপ খুঁজে পাচ্ছিলাম। তার সেই সৌন্দর্য প্রীতির নূণ্যতম কিছুই কি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারছি?

এমন কি এই শহরের রাজনীতিক প্রতিহিংসামুক্ত যে সহঅবস্থান, সুস্থ্য রাজনৈতিক পরিবেশ তিনি তৈরি করে রেখে গেছেন। আমরা বরিশালবাসী হয়তো সেই অবদানের চর্চা বর্তমান তরুণতুর্কী মেয়রের মধ্যে সমুন্নত দেখে কিছুটা অন্তত স্বস্তিবোধ করতে পারছি।

তাহলে, এই এতোসব কৃতিত্বের দাবীদার হিসেবে, আজও কি আমরা মেয়র শওকত হোসেন হিরনের অবদানকেই আকপটে স্বীকৃতি দিয়ে, তার মহানুভবতার কথা নানাভাবেই স্মরণ করছি না? কর্মই যদি জীবন হয়। তাহলে আমরা এটা সকলেই জানি যে, অন্তত এক জীবনেই…এতাবৎকাল, কোনও খাপেই জীবনের পুরোটা লুকানো সম্ভব নয়।

মেয়র হিরনকে একজন সফল মানুষ মনে করে নিতে গেলেই, তার নেতৃত্বের অসামান্য সাফল্যগুলো, তার- অন্যান্য ব্যর্থতার তুলনায় একটু বেশিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে না কি? আমরা তো, এও উপলব্ধি করি যে, মেয়র শওকত হোসেন হিরনের স্বপ্নেই, বরিশালের সকল দলের নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ এখনও উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সুশাসনের স্বপ্ন দেখে।…দেখে!

এর কারণ ছিল আনেক, মেয়র হিরন ছিলেন, অনেক উঁচ্চ মনের উঁচ্চ মানের নেতা। তৃণমূল থেকে রাজনীতি আরম্ভ করে অবান রাখছিলেন জাতীয় পর্যায়েও। পরমতসহিষ্ণু, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন উদার মনের বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন।

ফলে, তিনি বিশ্বাস করতেন সাংবিধানিক রাজনীতিতে। তাঁর রাজনৈতিক মূলমন্ত্র ছিল, মেয়র হিরন নিজের ঘরের বেডরুম পর্যন্ত কর্মীদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র করেছিলেন। তিনি কর্মীদের খুব ভালোবাসতেন। এ-জন্যেই তাঁর রাজনৈতিক দূরর্শিতা ও সুদৃঢ়তা এখনো আমাদের অবাক করে।

তাই, শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক মানুষের মৃত্যু নয়! এই মৃত্যু একটি গল্পেরও। কিন্তু গল্প তো মরে না, গল্পের বিষয়বস্তু মহৎ হলে ঐতিহ্যগতভাবে তা রূপকথার সামিল হয়ে ওঠে। কেননা, আমরা তো জানি, আগামী আরও অনেক গল্পের জন্মের প্রয়োজনে অতীত গল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

কিন্তু, আজ কি তাহলে শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুদিন সিটি কর্পোলেশনের অডিটোরিয়ামে সারম্বরে পালিত হবে? সেখানে তাঁকে নিয়ে উচ্ছাস, আবেগ, স্মরণালাপ এসেব কিবছুই হবে না, জানি! কারণ, হিংসা আর প্রতিহিংসা আমাদের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে।

রাজনীতির ময়দানে এই ব্যাধি আজও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মারত্মক করোনার হাঁচি-কাশির মতোই ছোঁয়াচে। কিন্তু মেয়র শওকত হোসেন হিরনের মতো সফলপ্রাণ মানুষের কৃতীত্ব বা উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো পাথরে খোদাই করে রাখবে, নাকি তাঁর সমস্ত কৃতিত্বের প্রস্তরফলক দেখে…এই শহরের বাসিন্দারা যেমন, বর্তমানেও কাঁদছে-ভবিষ্যতেও কাঁদবে…!

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন