বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ২৫, ২০২১

ই-পেপার

আটক শ্রমিকদের মুক্তির দাবিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৮ রুটে বাস চলাচল বন্ধ: যত্রীদের ভোগান্তি

আলামিন জুয়েল | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১

একদিকে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অপর দিকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তাকৃত দুই শ্রমিকের মুক্তির দাবিতে সকাল থেকে বরিশাল নগরীর রুপাতলী বাস টার্মিনাল থেকে ধর্মঘটের যাক দিয়েছে বরিশাল-পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন।

এর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৭ জেলার ১৮ রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এই দাবিতে নগরীর রূপাতলী বাস টার্মিনালের আশপাশের ৮টি পয়েন্টে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে আগুন দিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে তারা। গ্রেফতারকৃত দুই শ্রমিকের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের আন্দোলন এবং বাস চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা।

অপরদিকে, সকাল থেকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন বরিশাল-পটুয়াখালী-ভোলা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার মূল হোতাকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। দুই পক্ষের আন্দোলনের কারণে চরম দূভোর্গে পড়েছে দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ।

জানাগেছে, সকাল থেকে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে নগরীর রুপাতলী বাস টার্মিনালের সামনে সুরভী চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরা। এসময় তারা টায়ারে অগ্নিসংযোগ ও রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এতে করে দূভোগে পরেছে হাজার হাজার যাত্রী। অনেকেই হেটে গন্তেব্যে পৌছানোর চেষ্টা করছে। বিকল্প হিসেবে মটর সাইকেল যোগে যাচ্ছে অনেকে।

বরিশাল পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওছার হোসেন শিপন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মামলায় আমাদের দুই শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। যাদের ষড়যন্ত্রমূলক গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের কোনো লোক ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়নি।

তিনি বলেন, যাদেরকে হ্রেপ্তার করেছে পুলিশ তারা এই ঘটনার সাথে জড়িত না। আমাদের শ্রমিকদের মুক্তি না দিলে আন্দোলন চলবে। ২১ শে ফেব্রুয়ারির কথা চিন্তা করে বিষয়টি কিভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম জানান, শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছে। ওদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন করছে। আমরা উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।

সকালে রুপাতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত যাত্রীরা বাস বন্ধ থাকায় পায়ে হেটে, মটর সাইকেল যোগে গন্তেব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে।

সেলিম সিকদার নামের এক ব্যাক্তি বলেণ, ঝালকাঠি যাওয়ার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি এখানেও আন্দোলন চলছে। এখন বাড়তি টাকা দিয়ে মোটর সাইকেলে যেতে হচাছে।

নাজমা বেগম নামের পিরোজপুরের এক যাত্রী বলেন, ছেলে মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়েছি। আন্দোলনের কারনে গাড়ী বন্ধ। এখন বাড়ি যাবো কিভাবে বুঝতে পারছিনা।

এদিকে , আন্দোলনের চতুর্থ দিনে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মেসে হামলার ঘটনায় করা মামলায় তাদের অভিযুক্তদের নাম অর্ন্তভুক্ত করার দাবিতে শনিবার সকাল ৯টা থেকে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করে তারা।

অপরদিকে, গত মঙ্গলবার বরিশাল নগরের রুপাতলী হাউজিং এলাকায় গভীর রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেসে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় দুই শ্রমিককে আটক করেছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সাল রুমি।

এর আগে রাত ২টার দিকে বরিশাল নগরের রুপাতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন, সাউথ বেঙ্গল পরিবহনের হেলপার মো. ফিরোজ মুন্সী ও এমকে পরিবহনের সুপারভাইজার আবুল বাশার রনি। এরা দুজনেই রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা। এদের দুজনকেই একটি বাসের মধ্যে থেকে গ্রেফতার করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে নগরীর রুপাতলী হাউজিং এলাকায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মেসে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মামলা দায়েরের পর শুক্রবার রাতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

ওই রাতে নগরের রুপাতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। বাকি হামলাকারীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের টানা চতুর্থ দিনের আন্দোলনে বন্ধ রয়েছে বরিশাল – কুয়াকাটা সড়কের যানচলাচল। সকাল থেকে মহাসড়কে আটকা পড়েছে শত শত যানবাহন। সকাল থেকে মহাসড়কের টায়ার জ্বালিয়ে, বাঁশ, বেঞ্চ বা কাঠের তক্তা ফেলে রাখা হয়েছে। সেখানে বাধা পেয়ে যানবাহন থেকে নেমে অনেকেই হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছেন। দফায় দফায় মহাসড়ক অবরুদ্ধ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এই রাস্তায় নিয়মিত চলাচলকারীরা।

এছাড়াও টানা তিন দিনের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকরাও পরেছেন বিপাকে। ঢাকা থেকে কুয়াকাটার উদ্যোশে রওনা হওয়া পরিমল বলেন, পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে কুয়াকাটা যাচ্ছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখি শিক্ষার্থীদের অবরোধ চলছে। পরিবার নিয়ে এতখানী রাস্তা হাটা সম্ভব না। এখন কি করবো বুঝতে পারছিনা।

শান্তা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমিও একজন শিক্ষার্থী এখানে এসে শুনেছি শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করা হয়েছে। বিচার আমিও চাই। তবে সাধারন মানুষের ভোগান্তি করে কিসের বিচার। সাদ্দাম হোসেন নামের এক যুবক বলেণ, এই সমস্যার সমাধান না হলে ভোগান্তি বাড়বে। তাই দ্রুত এর সমাধান করা দরকার।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, তাদের অভিযোগ করা হামলাকারীদের নাম মামলায় দেয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে শুক্রবার বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে মশাল মিছিল করেন তারা। এর পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে দাবি পূরণের জন্য ১৩ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে সড়ক থেসে সড়ে যান তারা। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ায় আবারও মহাসড়কে নেমেছন শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সুব্রত কুমার দাস বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যে তিনটি দাবি ছিলে সেগুলো মানা হয়েছে। তাদের এখন কী দাবি রয়েছে সেটা শুনব। তারপর সেই অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

এদিকে, মঙ্গলবার রাতে পরিবহন শ্রমিকদের হামলার স্বীকার ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাহামুদুল হাসান তমাল জানান, বরিশাল নগরের রুপাতলী হাউজিং এলাকার ২২ নম্বর রোডে আমাদের হারুন অর রশিদ ছাত্রাবাসে হামলার ঘটনা ঘটে। যে ভবনের উল্টোপাশে থাকা মুসা প্যালেসের সিসি ক্যামেরায় হামলার পুরো ঘটনা রেকর্ড হয়েছিলো।

কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যার পর ডিবি পরিচয়ে সেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজগুলো ডিলেট করে দেওয়া হয়। ওই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই জানা যেত কারা হামলা চালিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার দুপুরে রুপাতলী বিআরটিসি বাস কাউন্টারে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে। এরপর রাতে রুপাতলী হাউজিং এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মেসে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। এতে ১১ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হামলার প্রতিবাদ ও এ ঘটনায় মামলা দায়েরসহ হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে বুধবার সকাল থেকে ঢাকা কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। ১০ ঘণ্টা পর প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।

হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা দায়েরের পর সেই মামলা প্রত্যাখান করে পুনরায় শুক্রবার সড়ক অবরোধ ও মশাল মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। এরপর পুনরায় ১৩ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় তারা।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন