সোমবার, মার্চ ৮, ২০২১

ই-পেপার

বিতর্কিতদের নিয়েই বরিশালে ছাত্রদলের ৩১টি ইউনিট কমিটি ঘোষণা

খান রুবেল | আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০২১

তুমুল বিতর্ক আর বিরোধিতার মধ্যেই ঘোষণা হলো বরিশাল জেলা ছাত্রদলের অধীনস্ত ৩১টি ইউনিটের আহ্বায়ক কমিটি। বৃহস্পতিবার রাতে বিতর্কিত এবং অছাত্রদের দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করে জেলা ছাত্রদল। এর ফলে জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পরে ছাত্রদলের ১০টি উপজেলা, ৬টি পৌরসভা এবং ১৫টি কলেজ কমিটি ঘোষণা হলেও এ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন ছাত্রদলের জেলা কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক।

অভিযোগ উঠেছে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ছাত্রদলের জেলা কমিটির বিতর্কিত সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠু এবং সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান অযোগ্য, অছাত্র এবং বিতর্কিতদের নিয়ে ৩১টি ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ে শুধুমাত্র বঞ্চিত নেতাকর্মীই নন, বরং ছাত্রদলের বরিশাল জেলা ও মহানগর এমনকি মূল দল বিএনপি’র নেতৃবৃন্দও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা এই কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি এ কমিটির বিরুদ্ধে পাল্টা কমিটি দেয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন জেলা ছাত্রদলের সুপারফাইভ কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

জানা গেছে, দীর্ঘ দিন থেকেই বরিশাল জেলা ছাত্রদলের অধীনস্ত ৩১টি ইউনিট কমিটি নিয়ে বিতর্ক চলছে। জেলা ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃবৃন্দ কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার শুরুতেই বিতর্কের সৃষ্টি করেন। তারা যোগ্যদের বঞ্চিত করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বিতর্কিত এবং অছাত্রদের নিয়ে কমিটি দেয়ার পাঁয়তারা চালান।

বিশেষ করে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠুর বিরুদ্ধে কমিটি গঠনের নামে বাণিজ্য করার শক্ত পোক্ত প্রমাণ পায় কেন্দ্রীয় কমিটি। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, জাতীয়, দৈনিক এবং অনলাইন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর পর পরই জেলা ছাত্রদলের বিতর্কিত মাহফুজুল আলম মিঠুকে কেন্দ্রের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সভাপতি’র পদ থেকে স্থগিত করা হয়।

এদিকে ছাত্রদলের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, কমিটি নিয়ে বাণিজ্যের বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি স্থানীয়ভাবে তদন্ত করেছে। ছাত্রদলের বরিশাল বিভাগের টিম লিডার ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বাপ্পি তদন্ত করে অভিযোগের তথ্য উপাথ্য খুঁজে পান। কিন্তু এর পরেও হঠাৎ করেই বিতর্কিত ছাত্রদল নেতা মিঠু’র সকল পদ ফিরিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি।

শুধু তাই নয়, দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার বিতর্কিতদের নিয়েই ৩১টি ইউনিট কমিটি ঘোষণা করেন তিনি ও জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান। যার অধিকাংশ কমিটিতেই বিবাহিত, অছাত্র, অসাংগঠনিক লোকদের আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে। এমনকি কলেজের ছাত্র নন, এমন ব্যক্তিকেও কলেজ কমিটির নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, হিজলা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে মহসিন সিকদারকে। যার নেই ছাত্রত্ব। এমনকি তিনি বিবাহিত। ছাত্রদলের বিভাগীয় টিম লিডার তদন্ত করে এসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছেন। এর পরেও শুধুমাত্র ছাত্রদল জেলা কমিটির সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠুর লোক হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদ উপহার হিসেবে পেয়েছেন তিনি।

একই কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয়েছে সাইদুর রহমান সোহাগকে। যিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে ইতিপূর্বে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাছাড়া তিনি প্রতিবন্ধী হওয়ায় সরকার থেকে ভাতাও গ্রহণ করছেন বলে স্থানীয় ছাত্রদলের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, রইচ উদ্দিন আকন, সদস্য জহিরুল ইসলাম রিফাত মাঝি তিনজনই বিবাহিত। তাজুল ইসলাম নামের অপর একজন সদস্য রয়েছেন যার নেই ছাত্রত্ব। অথচ ছাত্রদলের বিধি মোতাবেক ছাত্রত্ব নেই এবং বিবাহিত এমন কেউ কমিটিতে আসতে পারবেন না।

এদিকে হিজলা কলেজ কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে গাজী সাইদুল ইসলামকে। যিনি ২০১৮ সালে ডিগ্রি পাস করেছেন। এর পর থেকে আর লেখাপড়া করছেন না। সদস্য সচিব জহির উদ্দিন সিকদার একই বছর ডিগ্রি পাস করে ছাত্রজীবন থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ কমিটিতে একজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যিনি ওই কলেজের ছাত্রই নন।

মুলাদী উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে মহিউদ্দিন ঢালীকে। যিনি ২০১১ সালে এসএসসি পাস করেছেন। এরপর থেকে আর লেখা পড়া করেননি। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়েছে সাহাদাৎ হোসেন সোহাগকে। যিনি চার বার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছেন। কিন্তু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে না পারায় কোন কলেজে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। যে কারণে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করাও সম্ভব হয়নি।

এ উপজেলায় সদস্য সচিব করা হয়েছে জুবায়ের মাহমুদকে। যার রাজনৈতিক কোন ব্যাকগ্রাউন্ড নেই বলেও দাবি করেছেন উপজেলার কমিটি বঞ্চিত এবং অবমূল্যায়ন হওয়া নেতৃবৃন্দ।

বরিশাল সদর উপজেলা কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে মো. আব্দুল কাদের নামের যুবককে। যার ছাত্রত্ব নেই বলে দাবি করেছেন বঞ্চিত নেতারা। এমনকি তিনি বরিশাল সদরের বাসিন্দাও নন। শুধুমাত্র জেলা সভাপতি মিঠু’র ব্যক্তিগত কার্যক্রম সম্পাদন করায় উপহার স্বরূপ পদ পেয়েছেন তিনি। আর এ কমিটির সদস্য সচিব আল আমিন, যিনি জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এইচ.এম তসলিম উদ্দিনের ব্যক্তিগত লোক হিসেবে পরিচিত। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও নেতার আশীর্বাদে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন তিনি।

এছাড়া বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদল এবং কলেজ কমিটি নিয়েও চলছে বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপি থেকে মনোনীত ছাত্রনেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত কমিটিতে জায়গা করে দেয়া হয়েছে। এ কারণে ওই কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

এসব বিষয় নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান এর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের নম্বর দুটি বন্ধ পাওয়া যায়।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন