বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার ৮০ শতাংশই তরুণ

বিএসএল নিউজ ডেস্ক: | আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০২০

সন্তানের জেদের কারণে ১৭ বছর ৫ মাস বয়সের একমাত্র ছেলে মোশাররফ হোসেনকে মোটরসাইকেল কিনে দেন খুলনা ফুলবাড়িয়ার বাসিন্দা ফজলুর রহমান। মোটরসাইকেল কেনার দেড় মাস পরেই প্রাইভেটকারের সঙ্গে সংঘর্ষে ডান পা হারিয়ে গত ১৮ দিন ধরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা নিচ্ছেন। সন্তানের বায়না মেটাতে কেনা হচ্ছে মোটরসাইকেল। আবার দ্রুত যাতায়াত কিংবা আয়ের মাধ্যম হিসেবে মোটরসাইকেলকে বেছে নিচ্ছেন তরুণ প্রজন্ম। এতেই পরিবারে বিপত্তি ঘটছে।

পরিবারের ভবিষ্যত বা একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পরিবারেরই বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। গত দুই থেকে তিন বছরে রাজধানীসহ সারাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কয়েকগুণ বেড়েছে। যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই তরুণ আর ২০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা নিতে এসেছেন।

জানা গেছে, রাজধানীর আগারগাঁও জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১০০ শতাংশের মধ্যে ৭৫ শতাংশ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন। এরমধ্যে ৫০ শতাংশের ওপরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। আর ২৫ শতাংশ নসিমন, ভ্যান, রিকশা, বাইসাইকেলসহ অন্যান্য দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসেন।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হাসপাতালে দৈনিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, সেই হিসেবে মাসে দেড়শ’ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন হাসপাতালটিতে। বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে হাসপাতালটিতে ১ হাজার ৮শ’ জন চিকিৎসা নিতে আসেন। যাদের অনেকের হাত ও পা কেটে ফেলতে হয় । এই চিত্র শুধুই জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠান বা পঙ্গু হাসপাতালের। এছাড়া সারাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরের হাসপাতালগুলোতেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রায় একই রকম মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে গতকাল রোববার (১৫ নভেম্বর) ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে ৫ জনই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাদের বয়স ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। হাসপাতালের চিকিৎসার বিষয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক ও পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল গনি মোল্লাহ্ আরটিভি নিউজকে বলেন, তরুণরাই সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছেন। তাদের বেশির ভাগেরই কোমর, হাত ও পা ভেঙে হাসপাতালে আসেন। অনেকেরই হাত ও পা কেটে ফেলতে হয়। এতে সংসারের আয়ের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিটিই হয়ে পড়েন পরিবারের বোঝা।

ডা. মো. আব্দুল গনি মোল্লাহ বলেন, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই আসে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে। যার ৫০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার, বাকি ২৫ শতাংশ অন্যান্য সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী।

তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের সাবধান থাকতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। অধিক গতিতে মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। একই সড়কে দুই মুখ থেকে গাড়ি চালানো যাবে না। সড়কে একমুখী যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। এক মোটরসাইকেলে দুই জনের বেশি চলাচল করা যাবে না। তাহলেই দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা কমে আসবে।

সম্প্রতি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে গত ১০ মাসে সারাদেশে ১ হাজার ১১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭২৪ জনের বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী। পেশাগত দিক বিবেচনায় নিহতদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০৮ জন শিক্ষার্থী এবং ৩৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেছে ১২৪ জন পথচারীর, যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

সংগঠনটি তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যান্য যানবাহনের দুর্ঘটনার সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ পর্যায়ে। মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক আরটিভি নিউজকে বলেন, মোটরসাইকেল চালানোর জন্য দেশে আলাদা কোনও লেন নেই। দুই চাকার বাহনটি দ্রুতগামী ও ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই ঝুঁকিপূর্ণ বাহনটি তরুণ প্রজন্ম বেছে নিয়েছে। ফলে দিন দিন সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মোহাম্মদ খান আরটিভি নিউজকে বলেন, সরকার পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারায় বেকার তরুণ প্রজন্ম আজ জীবিকার টানে মোটরসাইকেল বেছে নিচ্ছেন। এতে অনেকেই অকালে দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি, ড্রাইভিং লাইসেন্সের নামে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাজস্ব আদায় করলেও রাস্তাঘাটে আলাদা লেন করছে না।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নগর ব্যবস্থাপক যারা আছেন তাদের ব্যর্থতা রয়েছে। ঢাকা শহরে ৪ হাজার পাবলিক বাস নামানো হবে। গত ১২ বছর ধরে এটি শোনা যাচ্ছে কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঢাকা শহরে রাস্তার তুলনায় মোটরসাইকেল বেশি রয়েছে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন আরটিভি নিউজকে বলেন, শহরে মোটরসাইকেল চালকদের মাঝে হেলমেট পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এখনও হেলমেট ছাড়া তরুণরা মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। মোটরসাইকেল চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানাতে হবে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছে মোটরসাইকেল বিক্রয় করা যাবে না।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানী ডেস্কের দায়িত্বে থাকা হারুন-অর-রশিদ আরটিভি নিউজকে বলেন, শতকরা ৫০ শতাংশের ওপরে মানুষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। যাদের বয়স ১৫ বছর থেকে ৪৫ বছরের মতো। এর মধ্যে ২০ থেকে ৪৫ বছরের বয়স্ক মানুষ বেশি। দৈনিক অন্তত ৫ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন