মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১, ২০২০

স্বাধীনতার স্বাদ কি পাবে না সনদহীন মুক্তিযোদ্ধা মোক্তার!

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২০

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ভারতের বারাসাতে (থুবা) নিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ। যুদ্ধের মধ্যে হারিয়েছেন সঙ্গীদের,নিজে হয়েছেন আহত। যুদ্ধের পর পিরোজপুর কলেজ মাঠে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তিনিও অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন। হানাদার বাহিনীর দখলদারির বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গে মাঠে নেমেছিলেন দায়িত্ববোধ থেকেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁর এই বীর সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল আচরু করে নি। দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় বিভিন্ন নাম নিয়ে নানা সময়ে হয়েছে বিতর্ক। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতক পার হতে বসলেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার সন্তান মোক্তার হোসেন পান নি যোগ্য সম্মান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এম এ কবিরের (হামিদ) অধীনে যুদ্ধ করেছেন মোক্তার হোসেন। দেশ মাতৃকার মুক্তি সংগ্রাম করেছিলেন শুধুই দায়িত্ববোধ থেকে। কোনো প্রকার ব্যক্তিগত লাভের আশায় যুদ্ধে যান নি বিধায় স্বাধীনতার পরও কোনো অর্জনের পিছনে ছোটেন নি তিনি। কিন্তু পরবর্তীকালে স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নাম না থাকায় পুরোপুরি তাজ্জব বনে যেতে হয়েছে তাকে। মুক্তিযোদ্ধাকালীন বন্ধু, সহকর্মী আর পরিবারের কথায় তাই দিনের পর দিন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশ মাতৃকার এই বীর সেনানী। শুধুই একটু পরিচয়ের আশায়।

সত্তরের কোঠায় পা রাখা বৃদ্ধ মোক্তার হোসেন আবেগজাত কণ্ঠে আক্ষেপ নিয়ে জানান, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি ও কাউখালি এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। ভারতে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রেনিং নম্বর ৩৬৬৬। দেশকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রাখতে ইতস্তত করেন নি একটুও। কিন্তু সেই স্বাধীন দেশ তাকে একটুখানি মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় প্রদানে কৃপণতা দেখিয়েছে।

তিনি বলেন,‘ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সমস্ত প্রমাণপত্র আমার আছে। যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি তাদের মধ্যে জীবিত সহযোদ্ধারাও এ ব্যাপারে সাক্ষী দিয়েছেন। তবুও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দান করার যোগ্যতা আমাকে দেয়া হচ্ছে না’। আর এমন বিড়ম্বনা এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি। তাই অন্তত মৃত্যুর আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর৷

এই বীর সেনানীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হবার পরপরই বরিশাল ছেড়ে প্রথমে ঢাকা ও পরবর্তীতে খুলনাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা সনদের গুরুত্ব বুঝতে না পেরে প্রথমে এই সনদ সংগ্রহ করেন নি তিনি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর স্বাধীনতা বিরোধী সরকারের রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলা – অব মূল্যায়ন সনদের ব্যাপারে মোক্তার হোসেনের আগ্রহ বিনষ্ট করে দেয়। এরপর আওয়ামীলীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা বৃদ্ধি শুরু হলে তিনি সকল প্রমাণপত্র সংযুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নিজের নাম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর কাছে নাম তালিকাভুক্ত করতে ঘুষ দাবি করা হয়। যা তিনি মেনে নিতে পারেন নি বিধায় আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাঁর নাম অনুপস্থিত।

এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা মোক্তার হোসেনের পুত্র জাহিদ হাসান রেজা আরো জানান, বাবার জীবনের শেষ ইচ্ছা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় পরিচয় অর্জন। তাই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, উপজেলার সরকারি দপ্তরসমূহ, সমাজসেবা অফিস ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধরনা দিতে দিতে তারা ক্লান্ত। তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সমস্ত প্রমাণ ও যোগ্যতা তার বাবার থাকলেও অদৃশ্য কারণে বিষয়টি সমাধান হচ্ছে না। সর্বশেষ ২০১৭ সালে এ ব্যাপারে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপিল করা হলেও আজ তিন বছর যাবৎ বিষয়টি ঝুলে আছে।

মোক্তার হোসেনের রণাঙ্গনের সহযোদ্ধা আরেক সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা নজরুল শরীফ (গেজেট নং ১৭১৬) বলেন,‘ অনেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিয়েও আজ মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে জীবন বাজি রাখা মোক্তার হোসেন আজও পরিচয়হীন। এমন বিপরীতমুখী চিত্র দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধার জন্য কষ্টের এবং লজ্জার’। তিনি আশা প্রকাশ করেন বিলম্ব হলেও বর্তমান সরকার এবং প্রশাসন এ ব্যাপারে যথাযথ সমাধানে উদ্যোগী হবেন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন