রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২০

মহামারির ছোবলে দখিনের নার্সারি ব্যবসা: হচ্ছেনা বৃক্ষ মেলা

জুনাইদ খন্দকার | আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস থেকে রক্ষায় লকডাউন ঘোষণা করা হয় দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলাকে। এর ফলে সরকারি এবং বেসরকারি অনেক কার্যক্রমে ভাটা পড়ে যায়।

এমনকি পূর্বের ন্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পালন হয়নি অনেক জাতীয় দিবসও। ঠিক তেমনি মহামারি করোনার প্রভাব পড়েছে বৃক্ষ শিল্পেও। যেমনি কমে গেছে বৃক্ষের চারা বেচা বিক্রি, তেমনি এবার আয়োজন হয়নি বৃক্ষ মেলাও। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে এ ব্যবসার সাথে জড়িত দক্ষিণাঞ্চলে নার্সারি ব্যবসায়ীদের।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ‘প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আসলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় নার্সারী গুলোতে। কেননা এ মৌসুমের জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত জাতীয়ভাবে দেশব্যাপী বৃক্ষমেলার আয়োজন করা হয়। সারা দেশের ন্যায় বরিশাল নগরীতেও আয়োজন হয়ে থাকে বিভাগীয় বৃক্ষ মেলা।

যেখানে শুধুমাত্র বরিশাল নগরীরই নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি জেলা উপজেলা’র নার্সারী ব্যবসায়ীরা মেলায় অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন ফরজ, বনজী এবং ঔষধী গাছের সমারোহ ঘটে বৃক্ষ মেলায়।
ফলে মেলা আগমনের পূর্ব থেকেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় নার্সারী ব্যবসায়ীদের। বছর জুড়ে পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা গাছগুলো বৃক্ষ মেলায় প্রদর্শন এবং তা বিক্রি করে লাভবান হতে প্রস্তুতি নেন তারা।

কিন্তু মহামারি করোনা এবারের সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। সময় পেরিয়ে গেলেও আয়োজন হয়নি বৃক্ষ মেলার। তাই উৎসাহ নেই এই অঞ্চলের নার্সারী ব্যবসায়ী এমনকি বৃক্ষ প্রেমীদের মাঝে। অনেকটা অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে নার্সারী ব্যবসায়ীদের।

নগরীর বান্দ রোডস্থ শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল স্টেডিয়াম সংলগ্ন অপূর্ব নার্সারীর মালিক অনুপম মন্ডল বলেন, ‘বিভাগীয় পর্যায়ে বৃক্ষ মেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের বছর জুড়ে প্রস্তুতি থাকে। কেননা সারা বছর নার্সারীতে যে ক্রেতা আসে তার থেকে অনেক বেশী ক্রেতা সমাগম ঘটে বৃক্ষ মেলায়। সেখানে বেচা বিক্রিও হয় অনেক বেশি। এছাড়া মেলায় তোলা হয় বনসাইয়ের মতো দামি গাছও। আর এই বনসাইয়ের মূল ক্রেতাদের বেশিরভাগই মেলাকেন্দ্রিক।

তিনি বলেন, ‘করোনার প্রাদুর্ভাব রোধ এবং জনসমাগম ঠেকাতে এবার বৃক্ষ মেলার আয়োজন করা হয়নি। তার ওপর করোনার কারণে নার্সারিতেও ক্রেতা আসছেন না। তাই বেচা বিক্রিও হচ্ছে না। মহামারির কারণে এ বছর বেচা বিক্রি ৬০-৭০ শতাংশ কমে গেছে। এসব কারণে এ বছর নতুন করে চারাও উৎপাদন করছেন না নার্সারী মালিকরা।

তিনি আরও বলেন, ‘মহামারির কারণে বেচা বিক্রি না থাকায় নার্সারীর অনেক কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। বেতন দিতে না পারায় অনেকে কাজ ছেড়ে চলেও গেছেন। অথচ এই মহামারির মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে নার্সারী ব্যবসায়ীদের কোন ধরনের প্রণোদনা কিংবা সহায়তা দেয়া হয়নি। লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারিভাবে ব্যবসায়ীদের সার এবং কীটনাশক দিলেও কিছুটা উপকার হত। কিন্তু তা না করায় নার্সারী ব্যবসায়ী এবং এর সাথে জড়িতরা অনেকটা অসহায় জীবন যাপন করছেন বলে দাবি অপূর্ব মন্ডলের।

নগরীর বান্দ রোড এলাকার অপর এক নার্সারী ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতি বছর বরিশাল বিভাগীয় বৃক্ষ মেলার প্রতিটি স্টলে দৈনিক কমপক্ষে তিনজন করে কর্মী কাজ করতেন। তারা দৈনিক পাঁচ থেকে ছয়শত টাকা মজুরি পেতেন। এবছর মেলার আয়োজন না থাকায় ওইসব শ্রমিকরাও পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ওই ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘এ বছরটি বৃক্ষ মেলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আমরা আশাবাদী ছিলাম এবার বেচা বিক্রিও ভালো হবে। কেননা মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি মানুষকে কমপক্ষে একটি করে হলেও বৃক্ষ রোপণ করতে বলেছেন। তার এ ঘোষণার ফলে নার্সারী ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারতেন কিন্তু সেটা না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আরও হতাশ হয়েছেন।

নগরীর শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত স্টেডিয়াম সংলগ্ন গ্রীন গার্ডেন নার্সারির মালিক আবুল কালাম আজাদ জানান, ‘করোনাকালিন সময়ে আমাদের নার্সারী ব্যবসা একরকম বন্ধই ছিলো। মহামারির কারণে অবস্থা খুবই খারাপ যাচ্ছে। বেচা কেনা না থাকায় নার্সারিতেই সব গাছ পড়ে আছে। তাই মহাসংকটে পড়তে হয়েছে আমাদের।

এ ব্যাপারে বরিশাল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জিএম রফিক আহমেদ বলেন, ‘করোনার কারণে এবারের জাতীয় বৃক্ষ মেলা হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী বছর থেকে পুনরায় মেলা চালু হবে। এ বছর মেলা না হওয়ায় নার্সারী ব্যবসায়ীরা কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেটাই স্বাভাবিক। কেননা মহামারির কারণে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থাই ভেঙে পড়েছে। তার মধ্য থেকেই আমাদেরকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন