বরিশালে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক হায়হায় প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:০১

জুনাইদ খন্দকার, তানিম হাসান ইমন:

নগরীতে মাথা চারা দিয়ে উঠছে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক একটি হায়হায় কোম্পানি। যারা বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথিত চুক্তির কথা বলে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাচ্ছে। তাদের কাছে দেশী এবং ইন্ডিয়ান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ‘ডিসকাউন্ট কার্ড’ বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছে নগদ অর্থ। আর এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নারীদের। যারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহস্থলী নারীদের ভুল বুঝিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার টাকা।

সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক ওই প্রতিষ্ঠানটি’র প্রতারণার বিভিন্ন তথ্য চিত্র। উড়ে আসা ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানটির নেই নিজস্ব কোন ঠিকানা। অফিস আছে দাবি করলেও তার সত্যতা মেলেনি। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির কথা বলা হচ্ছে তার অধিকাংশ বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগতই নয়।

ভুক্তভোগী নগরীর কালুশাহ সড়কের বাসিন্দা মেহের নিগার নামের গৃহিণী জানান, ‘গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিকালে মধ্যবসয়ী এক নারী এসে দরজার কড়া নাড়েন। দরজা খুলতেই ওই নারী নিজেকে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে ওই নারী প্রতিষ্ঠানটির কার্ড ব্যবহার করলে কেনাকাটার ক্ষেত্রে নামিদামি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ শতাংশ মূল্য ছাড়ের প্রলোভন দেখান।

মেহের নিগার বলেন, ‘ওই নারী জানায় বরিশালে তাদের প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে এবং সেটি নগরীর আমতলার মোড় পানির ট্যাংক সংলগ্নে অবস্থিত। সে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে তাদের ওই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়ার জন্য বলেন। পরে তার কথা মতো এক হাজার টাকা দিয়ে ওই নারীর কাছ থেকে একটি মেম্বারশিপ কার্ড সংগ্রহ করি।

প্রতারণার শিকার ওই নারী আরও বলেন, ‘টাকা নিয়ে কার্ডটি দেয়ার পর পরই ওই নারী আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যান। তার তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যাবার বিষয়টি সন্দেহ জাগায়। পরে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারি ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রতারণার ফাঁদ। যারা মানুষকে ফাঁদে ফেলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে প্রতারণার শিকার ওই নারীর অভিযোগের সূত্র ধরে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করে বিএসএল নিউজ । এর পর পরই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল।

অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানাগেছে, ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক কোন প্রতিষ্ঠানই নেই বরিশালে। এমনকি আমতলা পানির ট্যাংক এলাকায় গিয়েও ওই নামের কোন অফিসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের নামে করা লিফলেটে উল্লেখ করা বেশ কয়েকটি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে বেরিয়ে আসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কেউ কেউ বলেছেন ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের কোন সম্পৃক্ততাই নেই।

‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ এর লিফলেটে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান নগরীর বটতলার ‘হাট সুপার সপ’ এ যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প পরিচালক বাকী বিল্লাহ ফেরদাউস বলেন, ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে কয়েকজন লোক আমাদের কাছে এসেছিলেন। তারা আমাদের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারের কথা বলেন এবং বিনিময়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের কার্ড দেখালে ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য মূল্য ১০ শতাংশ কম রাখার কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের কথা রাজি হয়েছি। তবে তাদের সাথে এ বিষয়ে লিখিতভাবে কোন চুক্তি হয়নি। মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। তবে তারা যে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে সে বিষয়টি আমাদের জানা ছিলো না। তাছাড়া ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানের কোন অফিস আছে কিনা এবং থাকলে সেটি কোথায় তাও জানা নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের ওই কর্মকর্তা।

এদিকে লিফলেটে দেখা গেছে, পুলিশ লাইন্স রোডের ‘হুপার্স’ রেন্টুরেন্ট এর নামক উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তাছাড়া হলিডে টুর এন্ড ট্রাভেলস্ এর নাম লেখা থাকলেও নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। লিফলেটে উল্লেখ থাকা এমন আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলে তারা এ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান।

এসব বিষয়ে কথা হয় ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পরিচয় দেয়া মো. আযাদ নামক ব্যক্তির সাথে। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সাল থেকে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে। তবে বরিশাল শহরে আমাদের কোন অফিস কার্যক্রম নেই। বরিশালে শুধুমাত্র মার্কেটিং কার্যক্রম চলছে। যা ঢাকা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে বরিশালে চার-পাঁচজন লোক আছেন, তারা স্থানীয়ভাবে বিষয়টি দেখভাল করেন।

তিনি দাবি করে বলেন, ‘এটি কোন প্রতারণা বা হায়হায় কোম্পানি নয়। কেননা বরিশাল শহরেই প্রশাসনের প্রায় চারশত লোক আমাদের মেম্বারশিপ গ্রহণ করেছেন। এটি ভুয়া হলে তারাই আমাদের প্রশ্ন করতেন। তাছাড়া ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ এর কার্যক্রম শুরু বরিশালেই নয়, বরং ঢাকা এবং খুলনাসহ বরিশাল মহানগরীর বাইরেও চলমান রয়েছে। তবে ‘গ্রান্ট ওয়ান ডিসকাউন্ট’ নামক এই প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি এড়িয়ে যান।