মহামারির ক্ষত সারাবে কৃষি

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৩১

শফিক মুন্সি

করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে ইতোমধ্যে। সরকারি কোনো হিসেব না থাকলেও আশেপাশে তাকালেই পাওয়া যাচ্ছে করোনায় কর্ম হারানো কিংবা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দেখা। তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা তাদেরকে সামাজিকভাবেও ফেলেছে সংকটে। অনেকে শহরের শিল্পখাত থেকে ছিটকে পড়ে ফিরে আসছেন গ্রামে। এই পরিস্থিতি সামনে আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের। তবে মহামারি করোনার এই আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত সারাতে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ভূমিকা রাখবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে উদ্যোগী হয়েছে বলে জানা গেছে বরিশালের কৃষি সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। তবে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সানেম (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) এপ্রিল-মে মাসে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা দাবি করেছে, করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পঞ্চাশ লক্ষ থেকে এক কোটি লোক কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে যাবে। এছাড়া প্রায় অর্ধ কোটি (৫০ লক্ষ) পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভাটা পড়ে তারা দারিদ্র্য সীমার নীচে চলে যাবে। দেশে বিরাজমান প্রায় এক কোটি শিক্ষিত বেকারের সঙ্গে উপরোক্ত সংখ্যা গুলো যুক্ত হয়ে বিরাট ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। যেটা কাটাতে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি তাদের।

সানেম’র নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন,‘২০১৯ সালে যেখানে সরকারি হিসেবে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ ভাগ সেখানে এই পরিস্থিতিতে দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় ৪১ ভাগ হবে’। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি হতে পারে সবচেয়ে ভালো বিকল্প কর্মসংস্থান। যা থেকে উপার্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা কিংবা বৃদ্ধি দুটোই সম্ভব।

সরকারের পক্ষ থেকেও কৃষিতে মনোযোগী করার উদ্দেশ্যে জনগণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এই মৌসুমে বরিশাল জেলার পাঁচ হাজার পরিবারকে কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এছাড়া দুই হাজার সাতশো বিশ জন চাষীকে উন্নত মানের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা হয়েছে বিনামূল্যে।এছাড়া আউশ ও আমন ধান আবাদ নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা আছে তাদের। জেলায় কৃষিকাজ করতে ইচ্ছুক যেকেউ সরকারি এসব সহায়তা নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। এমন চিত্র নাকি দেশজুড়ে।

সরকার কৃষিতে আগ্রহীদের জন্য নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোঃ তাওফিকুল আলম। তিনি জানান, যারা খামার (শাক-সবজি, ফলমূল, মৎস্য বা কৃষি) করতে আগ্রহী তাদেরকে সরকার মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যেখানে বিনামূল্যে চাষীদের সার, কীটনাশক ও বীজ সরবরাহ করা হয়। এসব সহায়তা নিয়ে কৃষিকাজের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের পরামর্শ দেন এই সরকারি কর্মকর্তা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী ভাবে কৃষি ভিত্তিক পেশার দিকে ঝোঁকার আহবান জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রিফাত ফেরদৌস। তিনি জানান, প্রতিটি সমাজে কৃষিভিত্তিক পণ্যের চাহিদা দিনকে দিন বাড়ে। আবার কৃষির সঙ্গে জড়িত মানুষেরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি নিজেরা ব্যবহার করে জীবন রক্ষা করতে পারেন। তাই যারা শিল্পখাত থেকে ছিটকে পড়ছেন কিংবা কর্মসংস্থান খুঁজছেন তারা কৃষিতে মনোযোগী হতে পারেন।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন,‘পড়াশোনা শেষ করে টেবিল চেয়ারে বসে চাকরি করতে হবে এমন বদ্ধমূল ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আগের চেয়ে কৃষি পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া আমাদের দেশে পর্যাপ্ত আবাদি জমি রয়েছে। প্রযুক্তি আর আশেপাশে পতিত জমির সম্মিলন ঘটিয়ে যেকোনো বড় চাকরির চেয়ে কৃষি থেকে ভালো উপার্জন সম্ভব’। এছাড়া করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে শিল্পখাত ও চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের বাঁচাতে ও নতুন বাস্তবতায় আয়ের পথ উন্মুক্ত রাখতে কৃষিই একমাত্র ভরসা হতে পারে বলে জানান তিনি।

এদিকে কৃষিকাজ অন্যান্য যেকোনো ভালো পেশার মতোই সম্মানজনক ও অর্থকরি বলে জানিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোঃ ছাদেকুল আরেফিন। তিনি বলেন,‘বর্তমান সময়ে উন্নত দেশগুলোর আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত নাগরিকেরাও জৈব ও যান্ত্রিক কৃষির (অর্গানিক ফার্মিং) দিকে ঝুঁকছে। বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে যারা বিভিন্ন কারণে শিল্পখাত থেকে ছিটকে পড়ছেন কিংবা যারা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা ভাবছেন তাদের কৃষিতে মনোযোগী হওয়া উচিত। অন্তত বেকার কিংবা অলস সময় কাটানোর চেয়ে কৃষিতে শ্রম দিয়ে অর্থসংস্থান করা উত্তম বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

কিন্তু কৃষিতে আগ্রহী করতে জনগণের প্রতি সরকারি সুযোগ সুবিধা গুলো স্থানীয় পর্যায়ে এসে বিভিন্ন কারণে কার্যকারিতা হারায় বলে মনে করেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ইকবাল হোসেন তাপস। এই সচেতন রাজনৈতিক নেতা মনে করেন স্থানীয় পর্যায়ের উদাসীনতা, দুর্নীতি ও দলীয়করণ হ্রাস করে সরকারি সুযোগ গুলো যদি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া যায় তবে কৃষি জাতীয় অর্থনীতিকে করোনার থাবা থেকে মুক্ত করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পর্যায় থেকে সরকারি কোনো প্রণোদনা, সহায়তা কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের টাকা ছাড় করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে গিয়ে টাকার অংক তিনভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। এছাড়া সরকারি সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেয়া হয় আগে। এসব যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবে কৃষিকাজ জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা কার্যকর হবে’। এতে করে বর্তমান বাস্তবতায় আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা কৃষিকাজ করে নিজের ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবেন বলে ধারণা তাঁর।