৭১ এর এই রাতে আমার বাবাকে যেভাবে হত্যা করা হয়-তপন চক্রবর্তী

১২ আগস্ট ২০২০, ০০:২৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

আমার বাবা শহীদ সুধীর কুমার চক্রবর্তী বরিশালের একজন নামকরা আইনজীবী ছিলেন। প্রখ্যাত কৃষকনেতা জনাব আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের সাথে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৭০ সালে একদিন আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের কালীবাড়ি রোডের বাসায় বসে বাবার সাথে রব সাহেব। দু’জনেই আইনজীবী যদিও রব সাহেব রাজনীতির কারণে পেশায় বেশী সময় দিতে পারতেন না। বাবা যেদিন তাকে বলেছিলেন যে সিকস্তি পয়স্তি বর্তমান আইনটি বিরাট সমস্যা। নদী থেকে জমি উঠলেই জোতদাররা তা নিজের রপ্তের জমি অথবা ভেঙে যাওয়া জমি উঠেছে বলে দাবী করে আদালতে মামলা করে আর লাঠির জোরে জমি দখল করে। নদী ভাঙ্গলি লোকগুলি কখনোই তাদের হারানো জমি আর পায় না এবং এভাবেই ভূমিহীনদের সমস্যা বেড়েই যাচ্ছে। রব সাহেব সে দিন বাবাকে বলেছিলেন যে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জিতবেই আর এ আইনকে পরিবর্তন করে গণমুখী করা হবে।

বর সেরনিয়াবাত তার কথা রেখে ছিলেন ১৯৭২ সালে ভূমিমন্ত্রী হয়ে তিনি সিকস্তি পয়স্তি জমির আইন আমূল বদলে দিয়ে গণমুখী করেন যার বিশাল উপকার দরিদ্র বৃষকরা পেয়ে আসছেন। তবে আমার বাবা সুধীর চক্রবর্তী তা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭১ সালের ১২ আগস্ট পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে আমাদের বরিশাল শহরের চ্যাটার্জী লেনের বাসা থেকে রাতের বেলা ধরে নিয়ে যায়। সে রাতে বাবা সুধীর কুমার চক্রবর্তী, মা ঊষারানী এবং সারস্বত গার্লস স্কুলের তখনকার সহকারী প্রধান শিক্ষিকা রানী ভট্টাচার্য্য বাসায় ছিলেন।

রাত ১০ টার সময়ে একটি জিপ একটি সৈন্যবাহী গাড়ি আর একটি প্রাইভেট কার প্রায় নি:শব্দে আমাদের বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। প্রথম গাড়ি দুইটিতে পাক অফিসার আর সৈন্য এবং পরের প্রাইভেট কারে বরিশালের সদর রোডের একজন সুপরিচিত ব্যবসায়ী। সে এসেছে আমাদের বাড়ি চিনিয়ে দিতে আর পাকিস্তানের হেফাজত করতে। বাড়ির দরজায় প্রচ- ধাক্কা আর লাথি মারা শুরু সাথে গালাগালি কাফের কা বাচ্চা দরওয়াজা খোল।

বাবা টিনের ঘরের দোতলায় ছিলেন, নিচে নেমে দরজা খুলে দিতে বাধ্য হলেন। পাক অফিসার ঢুকে ভাঙা বাংলায় বাবাকে বলল আমি ক্যাপ্টেন মুনির তোমাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। বাবা বাধ্য হয়ে জামা গায়ে দিয়ে তৈরি হলেন। আলমারিতে সামান্য কিছু টাকা ছিল পাক ক্যাপ্টেন তা নিয়ে নিল, আগামীকাল সকালে খাওয়ার জন্য বাসায় কিছুই থাকলোনা। এরপর পাক ক্যাপ্টেন বাবার জামার কলার ধরে পশুর মত টানতে টানতে গাড়িতে তুললো। ৬৫ বছরের বৃদ্ধ অসহায় বাবার কাতরানি বা যন্ত্রণায় ‘পাক বীরেরা’ হাসতে লাগল।

এরপর গাড়ি বহর শহরের শীতলা খোলা মোড়ে নিয়ে একটি বাড়ি থেকে গৌরাঙ্গ দাস নামে এক যুবককে ঘুম থেকে তুলে মারতে মারতে নিয়ে গাড়িতে তুললো।

গাড়ি বহর এরপর বরিশাল শহরের ফকিরবাড়ি রোডে আইনজীবী আব্দুস সত্তারের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে ধরে এনে গাড়িতে তুলল। সত্তার সাহেব কিছু বলতে চেয়েছিলেন ক্যাপ্টেন মুনির প্রচ- এক চড় মেরে তার মুখ বন্ধ করে দিল। গাড়ি বহর এরপর চলল পাক বাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট ওয়াপদা হাউজের দিকে। প্রাইভেট কার অন্য দিকে চলে গেল। তার কাজ শেষ পাকিস্তানের শত্রুদের সে চিনিয়ে দিয়ে গেছে।

স্বাধীনতার পর এই প্রাইভেট কারের মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ও দালাল আইনে মামলা হয়েছিল কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব মাটিয়ে সে বেরিয়ে যায়। অথচ বিষয়টি সবাই জানতো।

পাক গাড়ি বহর এরপর ওয়াপদা হাউজে গিয়ে দাঁড়াল যেখানে সত্তার সাহেবকে নামিয়ে টর্চার চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হেল। তারপর চলল টর্চার। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তাকে বন্দী করে অমানুষিক টর্চার করা হয়।

বাবাকে আর গৌরাঙ্গকে নিয়ে গাড়ির বহর নদীর পাড়ের বধ্যভূমিতে গিয়ে দাঁড়াল। ক্যাপ্টেন মুনিরের ঘুম পেয়ে গিয়েছিল তাই সে নির্দেশ দিল- রাত তিন টা বাজে জলদি শুট করো। এরপর সৈন্যরা গৌরাঙ্গকে আর বাবাকে পরপর দাঁড়া করালো। যারা পাকিস্তানের খেলা দেখে আনন্দ পান বা সমর্থন করেন তাদের হয়তো এটা জেনে লজ্জা লাগবে কি ভাবে পাক সৈন্যরা এক লাইনে কয়েক জন বাঙালিকে দাঁড়িয়ে গুলি করে দেখতো ১টি গুলি কয়জনকে ভেদ করে যেতে পারে। এতে সময় আর গুলি দুইই বাঁচতো। গৌরাঙ্গ আর বাবাকে দাঁড় করানোর পর একজন পাক সৈন্য গুলি করার পজিশন নিলো। শেষ মুহূর্তে তরুণ গৌরাঙ্গ নদীতে ঝাঁপ দিলেন আর তার পরেই গুলিতে বাবার মৃতদেহ নদীতে গড়িয়ে পড়ে গেল। পাক সৈন্যরা গৌরাঙ্গের উদ্দেশ্যে কয়েক রাউন্ড গুলি চালালো। অন্ধকারে ডুব সাঁতার দিয়ে বেঁচে গেলেন গৌরাঙ্গ।

অপারেশন শেষ করে ‘বীর’ পাক সৈন্যরা ফিরে চললো। অনেক রাত আর পরিশ্রম হয়েছে, কালকে হয়তো আবার এরকম অপারেশন করতে হবে।