বানারীপাড়ায় ৬৪ বছরেও জরিপ না হওয়ায় ভূমি ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা

বানারীপাড়া প্রতিবেদক বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২০ ৯:৪৯ অপরাহ্ণ

বরিশালের বানারীপাড়ায় ৬৪ বছর ধরে সরকারী কোন জরিপ না হওয়ায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ জটিল ও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ উপজেলায় ১৯৫৬ সালে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত এস এ জরিপের পর গত প্রায় সাড়ে ৬ দশক ধরে আর কোন জরিপ না হওয়ায় রেকর্ড হালনাগাদ,রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের নামজারী কার্যক্রম মারাত্মক ভাবে বিঘিœত হচ্ছে।

রেকর্ড ভলিউম ছেড়া ও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মূল রেকর্ডীয় মালিকের নাম ও জমির তফসিল’র সঠিক তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম ব্যহত হয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়ে এ দপ্তরের কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া দিয়ারা জরিপ না হওয়ায় সন্ধ্যা নদীর তীরে জেগে ওঠা বিশাল চরের খাস সম্পত্তি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছেনা। এসব সম্পত্তি যে যেভাবে পারছে দখল করে ভোগ করছে। চরের বিশাল সম্পত্তির ধানের চাষ ও পরবর্তীতে ধান কাটা নিয়ে প্রতি বছর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও মামলা-পাল্টা মামলার ঘটনাও ঘটছে।

ভূমি সংক্রান্ত শত শত মামলায় নিঃস্ব ও রিক্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এদিকে ভূমি অফিসে কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাপ্তরিক কাজে গাফেলতি,অনিয়ম,দুর্নীতি এবং বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারনে বানারীপাড়া উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলো কার্যতঃ একটি জণহয়রানিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

যেখানে উৎকোচ ওপেন সিক্রেট বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সুবিধা নিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিখেকোরা। পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় বিপুল পরিমাণ খাস ও দেবোত্তর সম্পত্তি স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং ভিআইপিদের দখলে রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারী এ বিশাল পরিমাণ জমি বানারীপাড়ার বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের দখলে রয়েছে। উপজেলার হাজারও নদীভাঙ্গা অসহায় মানুষ একদিকে যাযাবর জীবনযাপন করছে,অপরদিকে সরকারি জমিতে একের পর এক গড়ে উঠছে পাকা স্থাপনা।

যে যেখান থেকে যেভাবে পেরেছে দখল করে নিয়েছে। পৌর শহরের বন্দর বাজার লাগোয়া সন্ধ্যা নদীর তীরে জেগে ওঠা বিশাল চর চান্দিনা ভিটা লিজ নেওয়ার নামে চলছে দখলের মহোৎসব। একেক জনের নামে আধা শতক সম্পত্তি লিজ নিয়ে এর কয়েকগুন দখল করে লিজের শর্ত ভঙ্গ করে একের পর এক নির্মাণ করা হচ্ছে পাকা স্থাপনা। আবার অনেকে লিজ না নিয়েই স্থাপনা নির্মাণ করছেন।

লিজের এসব সম্পত্তি অগ্নি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয়ও হচ্ছে। বিগত ৬৪ বছরে কোন সরকারি জরিপ না হওয়ায় ভূমিদস্যুদের জন্য সুবিধা হয়ে গেছে। অথচ নদীতে ফসলী জমি ও ভিটে মাটি সহ সব হারানো অসহায় মানুষ লিজ চেয়েও জমি না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এদিকে বার বার সরকারি জরিপের কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

ওই দখলদার প্রভাবশালী মহল সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘জরিপ হলে গরীব হয়ে যাবেন’ এ ভীতি সৃষ্টি করে এবং উচ্চ পর্যায়ে লবিং করে জরিপ প্রতিহত করছে বলে সচেতন মহলের ধারণা। প্রভাবশালী ভূমি খেকোরা সন্ধা নদীর উভয় পাড়ে প্রতিবছর যে নতুন নতুন চর পড়ছে তাও দখল করে নিচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসন বরাবরই নীরব থাকছে।

উপজেলা ভূমি অফিসে এ সংক্রান্ত তথ্য জানতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কোন কাগজপত্রই আপডেট নয় বলে জানায়। উপজেলার কোথায়,কি পরিমাণ খাস সম্পত্তি দখল ও বেদখল রয়েছে কিংবা কাকে কতটা লিজ দেয় হয়েছে এ ব্যপারেও সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় দখলদারদের যাবতীয় অপতৎপরতায় ভূমি অফিসের অসাধূ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বিভিন্ন সময় সহযোগিতা যুগিয়ে আসছেন।

ফলে সাধারণ মানুষ সেবার নামে সবসময়ই প্রতারিত হচেছন।ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবসময়ই স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের চাপের মধ্যে থাকায় তারা অসহায়ভাবেই আবার কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে সব কিছুতে সমর্থন-সহযোগিতা দিয়ে থাকেন এবং নিজেরাও আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশের প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারনা। এদিকে প্রায় একযুগ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটি শূণ্য থাকার পর ২০০৯ সালের ২৭ আগষ্ট পঙ্কজ ঘোষকে পদায়ন কর হলেও ২০১১ সালে ১১ মে তিনি অন্যত্র বদলী হয়ে যান। এর পর আবার শুণ্য হয়ে পড়ে এ পদটি। ৫ বছর পরে ২০১৬ সালের ১২ মে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে ইশরাত জাহান যোগদান করে পদোন্নতী জনিত কারনে ওই বছরের ২১ নভেম্বর তিনি চলে যান। ২০১৭ সালের ২৯ জানুয়ারী অজিত দেব যোগদান করে ২১ মে বদলী হয়ে যান। এরপর ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর এ পদে বিপুল চন্দ্র দাসকে পদায়ন করা হলে ২০১৮ সালের ২২ মে পদোন্নতি জনিত কারণে তিনি বদলী হয়ে যান। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ বকুল চন্দ্র কবিরনাজ যোগদান করে ২০ আগষ্ট বদলী হয়ে যান। ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর জাহিদ বিন কাসেমকে পদায়ন করা হয় কিন্তু তিনি মাত্র ১০ দিন পরে ১৯ ডিসেম্বর অন্যত্র বদলী হয়ে যাওয়ায় আবার শুণ্য হয়ে পরে এ পদটি। অপেক্ষার প্রহর শেষে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারী এ পদে অনুপ দাস যোগদান করেন।

এ প্রসঙ্গে নবাগত উপজেলা সহকারী কমিশনার ( ভূমি) অনুপ দাস জানান ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এ উপজেলায় জরিপ খুবই প্রয়োজন। যদিও জরিপের বিষয়টি জরিপ অধিদপ্তরের এখতিয়ারভূক্ত। তিনি আরও বলেন ভূমি অফিসে অনলাইনে ই- নামজারী কার্যক্রম শুরু হওয়ায় হয়রাণি হ্রাস পেয়ে মানুষ এখন সেবাটাই বেশী পাবে। বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আব্দুল্লাহ সাদীদ জানান এ উপজেলায় শিগগিরই জরিপ কাজ সম্পন্নের জন্য প্রক্রিয়া চলছে,ইতোমধ্যে উপজেলার ১৪টি মৌজা গেজেডভূক্ত হয়েছে বলে জরিপ অধিদপ্তর থেকে তিনি জানতে পেরেছেন।