গার্মেন্টস অপারেটর বানারীপাড়ার আকাশ এখন রিক্সাচালক

রাহাদ সুমন,বানারীপাড়া রবিবার, জুলাই ১২, ২০২০ ২:৫৫ অপরাহ্ণ

কোভিড-১৯ প্রাণঘাতি নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে বরিশালের বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের ভানান গ্রামের আকাশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। মাত্র দেড় বছর বয়সে জন্মধাত্রী মমতাময়ী মাকে হারিয়ে সৎ মায়ের সংসারে প্রতিটা মুহূর্ত তাকে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হতে হয়েছে। তাইতো ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মেধাবী ছাত্র আকাশকে দশম শ্রেণিতেই লেখাপড়ার ইতি টানতে হয়।

জীবন জীবিকার অন্বেষণে পাড়ি জমাতে হয় রাজধানীতে। এরপর শুরু হয় তার নতুন জীবন সংগ্রাম। ঢাকার সাভারে শ্রাবণী নিট ওয়্যার গার্মেন্টসে চাকরি নিয়ে মেধা ও শ্রমের সমন্বয়ে ধাপে ধাপে অপারেটর পদে পদোন্নতি পেয়ে ভালোই চলছিলো তার কর্মজীবন। সেখানে তার মূল বেতন সাড়ে ৯ হাজার টাকা হলেও ওভারটাইম নিয়ে ১৮/১৯ হাজার টাকা পড়তো। নিজে স্বাচ্ছন্দ্যে চলার পরেও গ্রামের বাড়িতে বাবা,সৎ মা ও দুই সৎ ভাই সহ চার জনের সংসার ও সৎ ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে সহায়তা করতো সে।

কিশোর চোখ ও মনে কতশত স্বপ্নের জাল বুনতো সে। শিশুকালে মা হারানো আকাশের সেই সুখ স্থায়ী হলো না। সর্বনাশা করোনাভাইরাস তার চাকরিটি কেড়ে নিয়ে তার দু’চোখে অমানিশার ঘোর অন্ধকার নামিয়ে দিয়েছে। গত ২৯ মার্চ সকালে গার্মেন্টসে ডিউটি করতে যাওয়ার পরে তার কাছ থেকে হাজিরার কার্ডটি কেড়ে নিয়ে একমাসের বেতন ধরিয়ে দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় তাকে সহ আরও ৫ শতাধিক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো। চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে আকাশ। বিভিন্ন গার্মেন্টেসে চাকরির জন্য ধর্না দিয়েও ব্যর্থ হয়। নিরুপায় হয়ে আবার ফিরে আসে সেই সৎ মায়ের সংসারে। দিন মজুর বাবা মহিউদ্দিন ফকিরের সংসারেও নিত্য অভাব-অনটন। করোনায় তিনিও বেকার। অবশেষে বানারীপাড়া পৌর শহরে ভাড়ায় চালিত অটোরিক্সা নিয়ে নামতে বাধ্য হয় আকাশ।

গত এক সপ্তাহ ধরে সে পৌর শহরে রিক্সা চালাচ্ছে। এখনও ঠিকমতো রিক্সা চালানো আয়ত্ত করতে পারেনি সে। পথঘাটও তার অচেনা। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে মালিককে ভাড়ার ২০০ টাকা দেওয়ার পরে দিনশেষে তার ১৫০-২০০ টাকা থাকে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সন্ধ্যায় বাজার সওদা নিয়ে বাড়ি ফেরে সে। নিরুপায় হয়ে রিক্সা চালালেও এ পেশায় স্থায়ী হতে চায় না সে। তার ঐকান্তিক বিশ্বাস করোনার এই ঘোর অমানিশা কেটে একদিন নতুন সূর্যোদয় হবে। পৃথিবী ফিরে পাবে তার চিরচেনা পুরনো সেই রূপ। সেই আলোয় সে আবারও খুঁজে পাবে আলোকিত পথের দিশা। ফিরে যাবে প্রিয় রাজধানীতে, ফিরে পাবে চাকরি। নব উদ্যমে কাজ করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি হতদরিদ্র পিতার ঘরে ফিরিয়ে আনবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য।

একই স্বপ্নের জাল বুনছেন গার্মেন্টসের চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে কখনও রিক্সা আবার কখনও রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ করা বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের ভানান গ্রামের শাহাদাৎ, শাওন, শাহিন, পৌর শহরের রায়েরহাটের তাওহিদ ও ভানান গ্রামের বেকার কুলসুমরা।