বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের দিন কাটে দুর্দশায়

নিজস্ব প্রতিবেদক বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২০ ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

বরিশাল বাকেরগঞ্জ উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী সন্ন্যামতের নাম শোনে নি এমন লোক কম আছে। ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি মৃত্যু বরণ করলেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে এখনো ফেরে।স্বাধীনতার পরও দেশগড়ায় মন উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি, উজাড় করেছেন নিজস্ব সম্পত্তিও। ব্যক্তিগত ভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার নানা উপায় থাকতেও তিনি সেগুলো বেছে নেন নি।এমন দেশপ্রেমিকের পরিবার বর্তমানে আছেন নানামুখী সংকট ও দুর্দশায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সতীর্থরা এই পরিবারের বর্তমান অবস্থায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।তবে জেলা প্রশাসন বলছেন এই পরিবারের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে যথাযথ সহযোগিতার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

উপজেলার ৬নং ফরিদপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ভাতশালা গ্রামে শওকত আলীর পৈতৃক নিবাস। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা গেলো একচালা টিনের বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাঁর পরিবারের ১১জন সদস্যকে।আগে এটা ছিল কাঠের দোতলা বিরাট বাড়ি।সময়ের বিবর্তনে আর অর্থনৈতিক সংকটে ২০১১ সালের ঘুর্ণিঝড়ে পুরোনো বাড়ি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।পরবর্তীতে তাঁর একমাত্র মেয়ে জামাই নিজের ক্ষুদ্র সঞ্চয় ভেঙে কোনোরকম মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বর্তমান বাসস্থানটি তৈরি করেন। বর্তমানে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বৃদ্ধ স্ত্রী, ৪ ছেলে ও ১ মেয়ে এবং তাদের পরিবার সকলে মিলে এখানেই আছেন।

শওকত আলীর পঞ্চম সন্তান নাইমুর রহমান সন্ন্যামত জানালেন তাদের নানা দুর্দশার কথা। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকারি ইউনাইটেড ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিলেন আমার বাবা। বঙ্গবন্ধু তাকে এলাকায় সংগঠন শক্ত করার কথা বলেন। সেই কথা মেনে চাকরি ছেড়ে বাকেরগঞ্জ আওয়ামীলীগের রাজনীতি সুসংগঠিত করায় মন দেন তিনি। ব্যক্তিগত খরচে দল চালাতে গিয়ে সমস্ত সহায় সম্বল শেষ করেছেন। কিন্তু আজ আমাদের প্রয়োজনে স্থানীয় কেউ পাশে থাকে না।এমনকি সরকারি কোনো সহায়তা পেতে গেলেও নানা অনিয়মের শিকার হতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধে শওকত আলীর সতীর্থ ছিলেন একই ইউনিয়নের আরেক মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান।তিনি জানালেন,স্বাধীনতার পরে পাকিস্তানী হানাদার ও স্থানীয় রাজাকার কর্তৃক যুদ্ধের সময় লুন্ঠনকৃত প্রায় ১৮ সের স্বর্ণ ও ৬ মণ রূপা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা উদ্ধার করে শওকত আলীর বাড়িতে জমা করে।যার বর্তমান বাজার মূল্য দশ কোটি টাকার বেশি। তিনি চাইলে এগুলো বিভিন্ন উপায়ে ভোগ করতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে এসব ধন দৌলত তৎকালীন পটুয়াখালী সরকারি ট্রেজারারিতে জমা করে দেন। যাতে করে দেশের উন্নয়নে এগুলো কাজে লাগে।

এমন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের বর্তমান নানা দুর্দশায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে পৈতৃক ধন দৌলত সমস্ত কিছু মুক্তিযোদ্ধা আর আওয়ামীলীগের কর্মীদের পিছনে ব্যয় করে গেছেন তিনি।বর্তমানে শেষ সম্বল তিন কক্ষের একটি টিনচালা বাড়িতে শওকত আলীর স্ত্রী এবং পাঁচ ছেলেমেয়ে নিজেদের পরিবার নিয়ে কষ্ট করে বসবাস করেন। এই পরিবারের বর্তমান জীবন সংগ্রাম আমাদের কষ্ট দেয়।

তার প্রসঙ্গে কথা হয় বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পুলক চ্যাটার্জির সাথে। তিনি বলেন, শওকত দুদু নামে অধিক পরিচিত শওকত কাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা, ত্যাগী আওমীলীগ নেতা ছিলেন। চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতেন। কিনতু বঙ্গবন্ধুর কর্মী ছিলেন বলেই কিছু করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর শওকত কাকা এবং আমরা ঢাকার সাভারে ৭মাস সেনাবাহিনীর নজরবন্দী ছিলাম। শকত কাকা মাননীয় তোফায়েল আহমেদ সহ বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ একাধিক আওয়ামীলীগ নেতার একান্ত কাছের ছিলেন। জাতির বীরসৈনিক মরহুম শওকত কাকার পরিবারের উপযুক্ত মূল্যায়নের দাবী জানাই।

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে শওকত আলীর আরেক সতীর্থ ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও ভোলা -১ আসনের সাংসদ তোফায়েল আহমেদ। প্রিয় সুহৃদের সন্তানদের বর্তমান দুর্দশার খবর পেয়ে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন,মুক্তিযুদ্ধের সময় বরিশাল বিভাগের হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। স্বাধীন দেশের নাগরিকেরা তাঁর অবদান কখনো অস্বীকার করতে পারবে না। তাই বাকেরগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উচিত শওকত আলীর পরিবারের পাশে থাকা।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয়েছিলো বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমানের সঙ্গে।তিনি জানান, বিগত দিনেও এই জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের অসহায় কিংবা সংকটে পড়া পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা। এই ধারা চলমান রয়েছে। তাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলীর পরিবারের খোঁজ নেয়া হবে। যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করে প্রশাসনের কার্যবিধির মধ্যে সর্বোচ্চ সহযোগিতার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।