কুয়েত সরকারের করা মসজিদ নিয়ে কথিত যুব নেতার ব্যক্তিগত রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক সোমবার, জুন ২৯, ২০২০ ৮:২৫ অপরাহ্ণ

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মসজিদ নির্মাণ করে দিচ্ছে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি। নির্দিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মিত এসব মসজিদ প্রতিষ্ঠায় পুরো ব্যয় বহন করছে কুয়েত সরকার। অথচ এক শ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী লোক এ নিয়েও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। তারা বিদেশী সংস্থার নির্মাণ করা ওইসব মসজিদের নির্মাতা হিসেবে নিজেদের নাম জুড়ে দিচ্ছেন।

এমনই একটি ঘটনার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে বরিশালের হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায়। দুই উপজেলায় কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি কর্তৃক নির্মিত পাঁচটি মসজিদের নাম ফলকে নির্মাতা হিসেবে নিজের নাম জুড়ে দিয়েছেন এম. হেলাল উদ্দিন নামের এক কথিত যুবদল নেতা।

শুধু নাম জুড়ে দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। বরং প্রতি বছর ঈদ এবং কোরবানীতে ওই পাঁচটি মসজিদের মুসল্লিদের জন্য আসা ইফতার সামগ্রী কিংবা পশুর মাংসেও ভাগ বসাচ্ছেন লিটন নামের ওই নেতা। ফলে এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ‘হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জে হাজী ওয়াজউদ্দিন বেপারী বাড়ি জামে মসজিদ, পশ্চিম খরকী বাইতুন নাজাত জামে মসজিদ, নয়াখালী খানবাড়ি দরজা জামে মসজিদসহ ৫টি মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি। অথচ প্রতিটি মসজিদের নাম ফলকে বাস্তবায়ন সংস্থা হিসেবে কুয়েতের ওই প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও নিচের অংশে বড় করে লেখা রয়েছে “সৌজন্যে- অ্যাডভোকেট এম. হেলাল উদ্দিন।”

বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। উপজেলার মধ্য ঘোষের চর বেপারী বাড়ি জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুল খালেক বেপারী বলেন, ‘আমাদের মসজিদটি নির্মাণ করে দিয়েছে কুয়েতের একটি সংস্থা। অথচ হেলাল উদ্দিন নামের ওই ব্যক্তি দাবি করছেন তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছেন মসজিদটি। এ কারণে মসজিদের নাম ফলকে সৌজন্য হিসেবে তিনি তার নাম লিখে দিয়েছেন। তাছাড়া মসজিদটি নির্মাণকালে এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে মসজিদ কমিটির কাছ থেকে। ওই টাকাও হেলাল উদ্দিনের মাধ্যমেই প্রদান করা হয়েছে।

মসজিদ কমিটির এই সভাপতি অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদ এবং কোরবানীতে কুয়েত থেকে এখানকার মুসল্লিদের জন্য বিভিন্ন অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। সর্বশেষ গত রমজানেও মসজিদের তালিকাভুক্ত ২৬ জন মুসল্লির নামে ইফতার সামগ্রী প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ২৬ জন মুসল্লির মাঝে ওই ইফতার সামগ্রী সঠিকভাবে বণ্টন করা সম্ভব হয়নি। কারণ কুয়েত থেকে আসা ২৬টি ইফতার ও খাদ্য সামগ্রীর ১০টিই নিয়ে গেছেন হেলাল উদ্দিন। তাই বাকি ১৬টি প্যাকেট ভেঙে ভাগ করে ৩২ জনকে দিতে হয়েছে। বাকি ১০টি হেলাল উদ্দিন কি করেছেন তা আমাদের জানা নেই।

তিনি আরও বলেন, এর আগে গত কোরবানীর সময় আমাদের মসজিদের জন্য ৩টি ছাগল পাঠানো হয়। যেটা ৬০ ভাগ করে মুসল্লিদের মধ্যে বণ্টনের জন্য নির্দেশনা ছিলো। কিন্তু হেলাল উদ্দিন ওই ছাগল জবাই করে ৮০ ভাগ করে ২০ ভাগ তিনি নিজেই নিয়ে যান। প্রথম ভেবেছিলাম হেলাল উদ্দিন কুয়েতের ওই সংস্থার সাথে জড়িত। কিন্তু গত ঈদে জানতে পেরেছি তিনি আসলে ওই সংস্থার কেউ নন। তিনি আসলে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। তাই এখন আর তাকে সেই সুযোগ দেয়া হবে না।

এ প্রসঙ্গে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটির একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সুজন ইসলাম জানান, ‘হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জে যে ৫টি মসজিদ করা হয়েছে তার পুরোটাই কুয়েতের টাকায় করা হয়েছে। মসজিদগুলো নির্মাণের পেছনে স্থানীয় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাত নেই। নিয়ম অনুযায়ী বাছাইতে টিকে যাওয়া ওই পাঁচটি মসজিদ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। কেউ যদি সেখানে সৌজন্যে নিজের নাম ব্যবহার করে থাকেন সেটা অন্যায় এবং প্রতারণা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ‘হেলাল উদ্দিন শুধুমাত্র কুয়েত সংস্থার ওই মসজিদ কমিটি এবং মুসল্লিদের সঙ্গেই প্রতারণা করেননি, নিজের পরিচিতি বাড়াতে এলাকার সাধারণ মানুষের সাথেও মিথ্যাচার করেছেন। এতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের’ নামটি। ওই ফাউন্ডেশন থেকে আনা ত্রাণ সামগ্রী নিজের নাম দিয়ে বিতরণ করছেন। যা এক ধরনের প্রতারণা বলেও অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীদের।

হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সিনিয়র পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, ‘হেলাল উদ্দিন নিজেকে যুবদল নেতা দাবি করছেন। অথচ কেন্দ্র কিংবা উপজেলার কোন ওয়ার্ড কমিটিতেও তার নাম নেই। শুধু তাই নয়, হেলাল নিজেকে বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইনজীবী বলেও পরিচয় দিয়ে বেড়ান বলে অভিযোগ নেতৃবৃন্দের।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, মেহেন্দিগঞ্জের চাঁনপুরের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন ঢাকায় আইন পেশার সাথে যুক্ত। কুয়েত সরকারের অর্থায়নে নির্মিত মসজিদে নিজের নাম ব্যবহার করায় স্থানীয়দের তোপের মুখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। তবে মাঝে মধ্যেই ঈদ বা কোরবানীতে নিজ এলাকায় ফেরেন হেলাল উদ্দিন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে হেলাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি কুয়েতের ওই সংস্থার কেউ না। মাঝে মধ্যে ওই সংস্থার কিছু মামলা কিংবা আইনী বিষয় থাকলে সেগুলো আমি বিনামূল্যে করে দেই। এ কারণেই তাদের সাথে আমার একটা ভালো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্পর্কের সুবাদে হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জে ৫টি মসজিদ নির্মাণ করতে পেরেছি।

মসজিদের নাম ফলকে সৌজন্যে নিজের নাম ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মসজিদ কুয়েতের টাকায় হয়েছে। কিন্তু যে নাম ফলকটা তৈরি হয়েছে সেটা আমার নিজের টাকায়। এ কারণে সেখানে সৌজন্যে আমার নামটা লেখা হয়েছে। তবে সেটা দান বক্সের ওপরে লাগানো হয়েছে। আর মুসল্লিদের জন্য আসা খাদ্য সহায়তা এবং কোরবানীর মাংসে ভাগ বসানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি তো গ্রামে যাই না, আমার এলাকায় যাওয়া নিষেধ। আমি পাঁচটি মসজিদ করে দেওয়ার পর পরই আমাকে এলাকা ছাড়া করা হয়েছে। আর ভালো কাজ করলে এমন বাধা এবং অভিযোগ আসবে এটাই স্বাভাবিক।

তবে তারেক রহমানের আইনজীবী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এই সম্পর্কে আমি আর কোন কথা বাড়াতে চাইনা। তাছাড়া কারা তাকে এলাকাছাড়া করেছেন সে বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি না হয়ে এড়িয়ে যান এবং ব্যস্ততার অজুহাত তুলে মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।