করোনায় ব্যাহত বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক সোমবার, জুন ২৯, ২০২০ ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ
স্বামীকে চিকিৎসা করাতে এসে চিকিৎসক না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এক অসহায় নারী- ছবি বিএসএল নিউজ।

চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও আন্তরিকতার অভাবে বরিশাল সদর হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে ভুক্তভোগীদের মাঝে। যে কারণে করোনাকালীন এই সংকট মুহূর্তে জেলার হাজার হাজার রোগী ও তাদের স্বজনদের পড়তে হচ্ছে বিপাকে। আর চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির পিছনে করোনা আক্রান্ত হবার ভয় মুখ্য হিসেবে কাজ করছে বলে জানা গেছে। এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা ও চিকিৎসা প্রদানকারীদের এমন চিত্র দেখে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি করোনাকালীন এই পরিস্থিতিতে উক্ত হাসপাতালের ব্যাপারে প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো গেলে স্বস্তি পেতো পুরো জেলার সাধারণ মানুষ।

গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১২ টায় সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কক্ষের দরজা বন্ধ। এমনকি ওয়ার্ড গুলোতেও চিকিৎসকদের খুব একটা দেখা নেই । কয়েকজনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কেউ জানান কিছুক্ষণ আগেই তারা হাসপাতাল থেকে চলে এসেছেন কেউ জানান ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তারা হাসপাতালে আসতে পারেন নি।

তবে একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান , প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে ডিউটি করার জন্য যে ধরনের ব্যক্তিগত করোনা প্রতিরোধক সামগ্রী (পিপিই) দেয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত ও কার্যকর নয়। মাত্র কদিন আগে সেখানকার চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ডা. এমদাদুল্লাহ খান করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যে কারণে তাদের পরিবার ভীত হয়ে তাদেরকে কর্মস্থলে আসায় বাধা প্রদান করছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে , তাদের সেখানে বর্তমানে জরুরী চিকিৎসা সহায়তা নিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন রোগী ভিড় করেন। জরুরী বিভাগে দায়িত্বরত নার্সিং কর্মকর্তা মোঃ ছগির হোসেন জানিয়েছেন ,গতকাল রোববার তাদের সেখানে ১৭ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। বহিঃবিভাগে এই সংখ্যা দুই থেকে তিনগুণ বেশি। কিন্তু এই প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে দেখা গেছে , চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির কারণে এত রোগী পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিতে পারছেন না।

এছাড়া সেখানে করোনা পরীক্ষার জন্য প্রতিদিন ৬০-৭০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নিজেদের পরীক্ষাগার না থাকায় এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য নগরীর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে হয় তাদের। পরীক্ষাগার না থাকলেও করোনা চিকিৎসার জন্য আলাদা ইউনিট আছে তাদের। সেখানে বর্তমানে ১১ জন রোগী চিকিৎসারত অবস্থায় আছে। তবে এই কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেবার চিত্র ফুটে উঠেছে সরেজমিনে প্রতিবেদন করতে গিয়ে।

হাসপাতালটিতে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করেন দুজন টেকনোলজিস্ট। তাদের মধ্যে একজন নওয়াব হোসেন। তিনি প্রতিদিন বাড়ি থেকেই এসে দায়িত্ব পালন করেন। করোনার নমুনা সংগ্রহ শেষে হাসপাতালে নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে জীবাণুমুক্ত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সেখানে নেই। গতকাল বেলা দুইটায় দেখা গেছে যে পোশাকাদি পরে তিনি বাড়ি থেকে এসেছিলেন সেভাবেই বাড়ি ফিরে যাবার জন্য হাসপাতালের সামনে গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাকে পরিবহনের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা হাসপাতাল প্রশাসন করে নি বলে জানিয়েছেন তিনি। যে কারণে তার মাধ্যমে অন্য মানুষদের করোনা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ফুটে ওঠে প্রকাশ্যে।

অন্যদিকে সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কথা হয় বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান , তাঁর ১৪ বছরের মেয়ে কদিন আগে গাছ থেকে পড়ে ব্যথা পেয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গেলে তারা এই হাসপাতালে যোগাযোগ করার জন্য বলে দেন । গত দুদিন মেয়েকে নিয়ে এখানে এলেও চিকিৎসক না পাওয়ায় সেবা বঞ্চিত রয়েছেন তারা।

এছাড়া হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক (আবাসিক মেডিকেল অফিসার) ডাঃ দেলোয়ার হোসেনের কাছে সংবাদ তৈরির জন্য কিছু তথ্য চাইতে গেলেও হতাশ হতে হয়েছে। তাকে হাসপাতালে বর্তমানে কতটি বিভাগ এবং কতজন চিকিৎসারত অবস্থায় ভর্তি আছেন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান , এসব তথ্য তাঁর আপাতত জানা নেই। এছাড়া সংবাদ সংগ্রহ করতে হলে তাকে আগে মুঠোফোনে জানিয়ে তারপর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আসার কথাও বলেন তিনি।

এসব ব্যাপার নিয়ে কথা হয় বরিশাল সদর হাসপাতাল উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি তারিক বিন ইসলামের সঙ্গে। তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানান , বরিশাল জেলার লক্ষাধিক মানুষের ভরসার জায়গা এই হাসপাতাল। কিন্তু চলমান সংকটময় মুহূর্তে এখানকার চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার নানা অভিযোগ তাঁর কাছেও এসেছে।

তিনি বলেন, হাসপাতালটির চিকিৎসকবৃন্দের নিকট আমাদের আহবান থাকবে তারা যেন বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ করেন ।অন্যদিকে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মতিউর রহমান জানান, অকার্যকর পিপিই এবং জনবল সংকটের দরুণ বর্তমানে জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালটির পরিষেবাগুলো থমকে যাবার পথে। তিনি আশা প্রকাশ করেন দ্রুত সরকারী প্রশাসনের তদারকিতে বর্তমান সংকট কেটে গিয়ে হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি পাবে।