‘তুমি রবে নীরবে’

শফিক মুন্সি বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২০ ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

তাঁর ফেসবুকের কভার ছবিতে এখনো শোভা পাচ্ছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা বিখ্যাত নিক ভুজিসিকের অমর বাণী, ‘এটা ভুল যে তুমি যথেষ্ট ভালো নও, এটা ভাবা ভুল যে তোমার কোন মূল্য নেই’। সবশেষ যে পোস্ট তিনি দিয়েছিলেন সেখানে আলোচিত হয়েছে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম – বিড়ম্বনা।

তিনি হলেন অকালে চলে যাওয়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবিদুল ইসলাম লাবিত। তাঁর বন্ধুরা জানিয়েছেন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সহ সকল বিষয়ে তাঁর ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ। সারাটা জীবন দুরারোগ্য রোগের সঙ্গে সংগ্রাম করা লাবিত সকলকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে এই সমাজে তাঁর মূল্য আছে, তিনি ভালো আর অনুকরণীয়দের দলে। তাইতো মাত্র ২৫ বছর বয়সে হঠাৎ চলে যাওয়ায় হাজারো মানুষের হৃদয় ছেয়ে গেছে শোক আর বেদনায়, লেখা হয়েছে কবিতা।

গত ২২ জুন রাত দেড়টায় দীর্ঘদিন ধরে ’স্কোলিওসিস’ নামক মেরুদণ্ডের রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে হার মানেন লাবিত। প্রিয় শিক্ষার্থীর এভাবে চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারেন নি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সুব্রত কুমার দাশ। আপ্লুত হয়ে তিনি জানান, সোজা হয়ে বসতে সমস্যা হতো ওর। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে স্নাতক জীবনের প্রতিটি পরীক্ষা দিয়েছে সে। ফাইনাল রেজাল্টে পুরো সহপাঠীদের পিছনে ফেলে অর্জন করে তৃতীয় স্থান। আরো ভালো ফলাফল করতে পারতো কিন্তু শেষ পরীক্ষার সময় লাবিতের শারীরিক জটিলতা বৃদ্ধি পায় কয়েকগুণ।

গতবছর লাবিতের একটি জরুরী অপারেশনের জন্য প্রায় ৭ লাখ টাকার দরকার হয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক সামর্থ্যে ওই অপারেশনটি করা সম্ভব ছিল না। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা দিন রাত মানুষের সাহায্য সংগ্রহ করে সেই টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এই স্বেচ্ছাসেবকদের দলে ছিলেন লাবিতের এক সহপাঠী সামিনাজ হাসান। তিনি জানান, অসুস্থতা কখনো তাকে মানসিকভাবে কাবু করতে পারে নি।

যতটুকু সময় সে বেঁচে ছিল আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও সফল জীবন উপভোগ করে গেছে সে। জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিল ৪০ তম বিসিএস প্রিলিমিনারি। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে পিছনে ফেলে সেখানেও সে উত্তীর্ণ হয়। এমন অনেক ঘটনা অন্য সবাইকে অনুপ্রেরণা জোগাতো। আর এসব ঘটনা এখন গল্প হিসেবেই রয়ে যাবে।

শারীরিক নানা প্রতিবন্ধকতা লাবিতকে কোনো সামাজিকতা থেকে বিরত রাখতে পারে নি। তাঁর বাল্যবন্ধু নাহিন রেজওয়ান জানিয়েছেন, মসজিদে নিয়মিত ধর্মীয় কর্মকা- কিংবা খেলার মাঠে বন্ধুদের উৎসাহ দেয়া সবকিছুতেই তিনি উপস্থিত থাকতেন। এছাড়া দেশ বা দেশের বাইরের নানা বিষয়ে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। শারীরিক সক্ষমতা কম থাকলেও মানসিক শক্তির কমতি ছিল না তাঁর। নিজের ব্যক্তিগত অনেক হতাশার দিনে লাবিতের জীবন সংগ্রাম টনিকের মতো কাজ করেছে বলেও জানান তিনি।

লাবিতের জীবন সংগ্রাম সকলের জন্য অনুকরণীয় বলে জানালেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোঃ ছাদেকুল আরেফিন। নিজ প্রতিষ্ঠানের অমিত সম্ভাবনাময় এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পরপরই মৃতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এমনকি যেখানে তিনি পড়াশোনা করেছেন সেই উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের কাছেও লাবিতের জীবনের ইতিহাস জেনেছেন।

উপাচার্য বলেন, শৈশব থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে প্রতিটি জায়গায় নিজের কৃতিত্বের জানান দিয়েছে আমাদের লাবিত। বর্তমান সময়ে যেখানে সুস্থ সবল তরুণেরা ছোট খাটো বিষয়ে হতাশ হয়ে পড়ে সেখানে লাবিত সবার কাছে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। আর তাঁর এই প্রতিবন্ধকতা জয়ের ইতিহাস নীরবে নিভৃতে অনেকের মনে রয়ে যাবে।