বন্ধের পথে ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটের এমভি পারিজাত ও দোয়েল পাখি

নিজস্ব প্রতিবেদক সোমবার, জুন ২২, ২০২০ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

বরিশাল-ভোলা-মজুচৌধুরীর হাট নৌ-রুটে সরকারি সময়সূচির তোয়াক্কা করছে না রাষ্ট্রীয় নৌ-যান এসটি খিজির-৫। কাগজে-কলমে সময়সূচি এক রকম থাকলেও চলাচল করছে ভিন্ন নিয়মে। এর ফলে যাত্রী সংকটে বন্ধ হওয়ার উপক্রম ঘটেছে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি যাত্রীবাহী নৌ-যান এমভি পারিজাত ও এমভি দোয়েল পাখি-১। এমনটি ঘটলে অভ্যন্তরীণ এই রুটের কয়েক লাখ যাত্রীকে পড়তে হবে সীমাহীন ভোগান্তিতে।

অভিযোগ উঠেছে, এসটি খিজির-৫ এর ইজারাদারকর্তৃক অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়েই সরকারি সময়সূচি পাল্টে দিয়েছেন ভোলা নদী বন্দর কর্মকর্তা (অতিরিক্ত পরিচালক) কামরুজ্জামান। যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিকে সামনে টেনে আনেন এই কর্মকর্তা।

বরিশাল নদী বন্দরে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, দীর্ঘ দিন ধরেই বরিশাল-মজুচৌধুরীর হাট ভায়া ভোলা নৌ-রুটে যাত্রী সেবায় নিয়জিত এমভি পারিজাত ও এমভি দোয়েল পাখি-১। বিআইডব্লিউটিএ’র দেওয়া সময় সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন ভোর ৬টায় মজুচৌধুরীর হাটের উদ্দেশে বরিশাল নদী বন্দর ত্যাগ করছে এমভি পারিজাত। মাঝে ভোলার ইলিশা ঘাটে যাত্রী নামিয়ে সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে পুনরায় মজুচৌধুরীর হাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। এরপর একই নিয়মে বেলা ১২টায় মজুচৌধুরীর হাট থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে আসে ওই জাহাজটি।

ঠিক একই নিয়মে প্রতিদিন সকাল ৭টায় বরিশাল নদী বন্দর থেকে মজুচৌধুরীর হাটের উদ্দেশে যাত্রা করে সকাল ১০টার মধ্যে ইলিশা ঘাটে পৌঁছায় এমভি দোয়েল পাখি-১। সকাল সাড়ে ১০টায় মজুচৌধুরীর হাটের উদ্দেশে যাত্রী এবং সেখান থেকে বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে পুনরায় বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করে এই লঞ্চটি।

সরকারি সময়সূচি মেনে যাত্রী পরিবহনের কারণে বরিশাল-ভোলা, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীদের কাছে খুব স্বল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে বেসরকারি এই নৌযান দুটি। কিন্তু বেসরকারি এই লঞ্চ দুটির জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের উপার্জনে ভাগ বসিয়েছেন রাষ্ট্রীয় নৌযান এস.টি খিজির-৫ এর ইজারাদার। তারা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই নিজেদের মত করে সময়সূচি পাল্টে এ রুটে যাত্রী পরিবহন করছেন।

এমভি পারিজাত এর মাস্টার নজরুল ইসলাম জানান, ‘সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী সকাল সাড়ে ১১টায় মজুচৌধুরীর হাটের উদ্দেশে ভোলার ইলিশা ঘাট ত্যাগ করবে এস.টি খিজির-৫। কাগজে কলমে নিয়ম এমনটি হলেও বাস্তবে মানা হচ্ছে না রুট পার্মিটের শর্তাবলী। বিআইডব্লিউটিএ’র কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করেই এস.টি খিজির চলাচল করছে।

তিনি বলেন, বেসরকারি এমভি পারিজাত ও দোয়েল পাখি-১ ইলিশা ঘাটে পৌঁছাবার আগেই সকাল পৌনে ৯টায় সেখান থেকে যাত্রী নিয়ে মজুচৌধুরীর হাটের উদ্দেশে যাত্রা করছে এস.টি খিজির। এমনকি মজুচৌধুরীর হাট থেকেও একইভাবে সময়সূচি না মেনেই আগেভাগে যাত্রী নিয়ে ভোলা পৌঁছাচ্ছে নৌযানটি। এর ফলে ভোলা থেকে যাত্রী পাচ্ছে না বেসরকারি নৌযান দুটি।

তাই কোন কোন সময় নামমাত্র যাত্রী নিয়েই মজুচৌধুরীর হাট এবং সেখান থেকে ভোলা পৌঁছতে হচ্ছে জাহাজ দুটিকে। তাই মালিক পক্ষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই রুটে লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রাখবে কিনা তা নিয়েও সংশয়ে ভুগছে। আর জাহাজটি বন্ধ হয়ে গেলে যেমনি যাত্রীদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, তেমনি বিপদে পড়তে হবে ঘাটের ইজারাদারদেরও।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র ভোলা নদী বন্দর কর্মকর্তা কামরুজ্জামান, ইলিশা নৌ পুলিশের পরিদর্শক জসিম উদ্দিন ও শাহজাহানের সহযোগিতায় কোন প্রকার সময়সূচি না মেনেই অবৈধভাবে চলাচল করছে এস.টি খিজির-৫। আর অনৈতিকভাবে এমন সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ায় উপহারস্বরূপ প্রতিদিনই মোটা অংকের উৎকোচ পাচ্ছেন তারা।

এস.টি খিজির-৫ এর অনিয়মের বিষয়ে জানতে বরিশাল নদী বন্দর কর্মকর্তা (যুগ্ম পরিচালক) ও নৌ নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, ‘নিয়ম বহির্ভূতভাবে সময়সূচি না মেনেই এস.টি খিজির পরিচালনার অভিযোগে পূর্বে থেকেই রয়েছে। এ নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ পেলেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। কেননা ব্যবস্থা গ্রহণের আগেই দপ্তর পরিবর্তন করে খিজির এর দায়িত্ব ভোলা পোর্ট অফিসকে দেয়া হয়েছে। এখন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ বা অভিযোগ থাকলে তারাই বিষয়টি দেখবেন।

এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এস.টি খিজিরের সময়সূচি না মেনে চলাচলের বিষয়টি অকপটেই স্বীকার করেন ভোলা নৌ বন্দর কর্মকর্তা কামরুজ্জামান। তবে তিনি কোন প্রকার ভাবিত না হয়ে বরং করোনা পরিস্থিতির কারণেই সময়সূচি পরিবর্তন করে খিজির পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন।

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভোলা ইলিশা ঘাট থেকে প্রচুর যাত্রী মজুচৌধুরীর হাট রুটে চলাচল করে এবং সকাল ৬টার মধ্যেই তারা পন্টুনে ভিড় জমায়। এতে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সেকারণেই সামাজিক দূরত্ব আর যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে নির্ধারিত সময়সূচির আগেই খিজির-৫ ছাড়ার অনুমতি দিয়েছি। তাছাড়া অনুমতি দেয়ার পূর্বে পারিজাত ও দোয়েল পাখি-১ লঞ্চ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে নিয়েছেন বলেও দাবি করেন এই কর্মকর্তা।

তবে ভোলা নদী বন্দর কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের এমন দাবি ভিত্তিহীন এবং কাল্পনিক বলে দাবি করেছে পারিজাত ও দোয়েল পাখি লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট লঞ্চ কোম্পানির ম্যানেজার আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘পোর্ট অফিসার কামরুজ্জামানের সাথে এ বিষয়ে আমাদের কোন কথা এমনকি যোগাযোগও হয়নি। তাছাড়া রুট পার্মিট এবং সময়সূচি নির্ধারণ করে থাকে ঢাকা থেকে। সেখানে একজন বন্দর কর্মকর্তা কিভাবে সময়সূচি নির্ধারণ করেন তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন লঞ্চ কোম্পানির ওই ম্যানেজার।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘পোর্ট অফিসার ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন বিধায় এস.টি খিজির চলাচলে সুবিধা করে দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের আগে জাহাজ চলাচলের সুবিধা করে দেওয়ায় তাকে প্রতি ট্রিপে ১৫ হাজার টাকা করে উৎকোচ প্রদান করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ বেসরকারি লঞ্চ কোম্পানির ম্যানেজার আব্দুস সাত্তারের। তাই খিজির চলাচলে এমন অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতা চেয়েছেন পারিজাত ও দোয়েল পাখি-১ লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।