নিজেকে জানুন…

কামরুল হাসান সোহাগ রবিবার, জুন ২১, ২০২০ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

প্রতিযোগিতা নিজের সাথে, সহযোগিতা সবার সাথে। আমাদের জীবনের শুরুটাই হয়েছে একটা প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। সেই জন্মের ইতিহাস দেখুন। কোটি কোটি শুক্রাণুর মধ্যে কেবল একটি শুক্রাণুই ভ্রূণ হওয়ার সুযোগ পায়। এতজনের সাথে লড়াই করে কেবল একটিই পায় অপূর্ব মানবজীবন। সেই তখন থেকেই আমাদের ডিএনএতে এই প্রতিযোগিতার প্রোগ্রামিং, কে পারবে অর্জন করতে!

তারপর জীবনের বিভিন্ন ধাপে আমরা বিভিন্ন প্রতিযেগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। ভালো স্কুলে ভর্তির প্রতিযোগিতা। ক্লাসে প্রথম হবার প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পেরিয়ে পাস করা, চাকুরি পাওয়া। চাকরিতে প্রমোশনের জন্যে প্রতিযোগিতা, বেতন বোনাস, বসের সুনজর অথবা ব্যবসায় টিকে থাকতে, শীর্ষে থাকতে প্রতিযোগিতা।

তারপর আছে ভালো কাজেরও প্রতিযোগিতা। জীবনে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রথম হবার প্রতিযোগিতা। আসলে জীবনে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন আছে। প্রতিযোগিতা না থাকলে জীবনে গতি থাকবে না, স্থবির হয়ে যাবে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা হতে হবে সবসময় নিজের সাথে নিজের।

একবার ক্রিকেটার অনিল কুম্বলেকে আটটি উইকেট পাবার পরে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনি এখন কাকে হারাতে চান। তিনি বলেছিলেন, আমি আমার নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙতে চাই। অর্থাৎ ১০টি উইকেট পেতে চাই। এরপরে তিনি ১০টি উইকেট পাবার রেকর্ড অর্জন করেছিলেন।

আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা নিজেদেরকে এগিয়ে নিতে গিয়ে অন্যকে প্রতিযোগী বানায়। এক্ষেত্রে সে যেন নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারলো। অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা মানে অপরপক্ষকে আপনি পেছনে ফেলে নিজেকে সামনের কাতারে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। এতে করে নিজের ভালো না হয়ে উল্টো ক্ষতিই হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা তাকাসূরের ১-২ আয়াতে বলা হয়েছে, ’’অপরের তুলনায় বেশী সুখ সম্পদ লাভের আকাঙক্ষাই মানুষকে আমৃত্যু মোহাচ্ছন্ন করে রাখে।

আমরা অনেকেই গোপাল ভাড়ের সেই প্রতিবেশীর গল্পটি জানি। গল্পটি ছিলো এমন-গোপাল ভাঁড়ের প্রতিবেশীর একতলা বাড়ি। গোপালের ২য় তলা বাড়ি। গোপাল তার বাড়ির ছাদ থেকে প্রতিবেশীকে ডেকে বলছে, কেমন আছো গো? প্রতিবেশী গোপালের কুশলের জবাব দিলেন না। একবছর পর তিনি যখন তার একতলা বাড়িকে তয় তলায় উন্নীত করতে পারলেন সেদিন ছাদে যেয়ে গোপালকে জবাব দিলেন ভালো আছি গো। এভাবে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনাগুলোকে নির্দিষ্ট একটা আবহে সীমাবদ্ধ করে ফেলি।

ধরুন আপনার চেয়ে একজন ব্যক্তি যখন একটু এগিয়ে আছে রেজাল্টের দিক থেকে বা চাকরিতে বা ভালো পাত্রের সাথে তার বিয়ে হয়েছে- এটিই আপনার প্রচন্ড মর্মবেদনার কারণ। যদি অন্যের কোনো আনন্দের সংবাদ শুনলে আপনার ভেতরে কষ্ট লাগে, তখনই বুঝতে হবে আপনি ঈর্ষায় ভুগছেন। আর এই ঈর্ষা হলো মানুষের জন্যে সবচেয়ে ধংসাত্বক একটি নেতিবাচক আবেগ। ঈর্ষাকারীরা আসলে স্রষ্টার নেয়ামতের শত্রু। ঈর্ষার পাত্র/ পাত্রীর নেয়ামত ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত সে তৃপ্ত হয় না। নবীজী (স) বিদায় হজের বাণীতে খুব স্পষ্ট করে বলেছেন- ‘তোমরা ঈর্ষা থেকে দূরে থাকো। আগুন যেমন কাঠকে ভস্মীভূত করে দেয়, ঈর্ষাও তেমনি মানুষের সৎকর্মকে ধ্বংস করে দেয়।

অন্যের চেয়ে আমি বেশি ভালও থাকবো এরুপ অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের কী দিচ্ছে? আজকাল পত্রপত্রিকায় দেখি প্লে-গ্রুপে ভর্তির জন্যে বাচ্চারা কোচিং করছে। বাবা-মায়ের প্রত্যাশার চাপ তাদের ছোট্ট কাঁধে। তারা বিসিএস পরীক্ষার মতো পরীক্ষা দিচ্ছে, পরীক্ষার হলে ভয়ে কান্নাকাটি করছে আর মা-বাবা বাইরে দোয়া দরূদ পড়ছে। এভাবে শিশুরা তাদের শৈশব হারিয়ে ফেলছে। তাদেরকে মানুষ হওয়ার পরিবর্তে শুধুমাত্র জিপিএ ফাইভ পেতে উদ্বুদ্ধ করছি।

আবার জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা দেখুন। সেখানে পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা আত্মহত্যার পর্যায়ে নিয়ে যায়। লেখক এবং শিক্ষাগবেষক আলফি কন শিক্ষা ব্যবস্থায় এজাতীয় প্রতিযোগিতার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘ছাত্রদের যোগ্যতা নির্ধারণে প্রতিযোগিতা প্রকৃতপক্ষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এটি আমাদের সবাইকে পরাজয়ের দিকে নিয়ে যায়’।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রিচার্ড লেয়ার্ডও প্রতিযোগিতার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিযোগিতার ফলে ছাত্ররা এক ধরণের চাপ অনুভব করে। তারা মনে করে যে তাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে অন্যান্যদের তুলনায় সেরা হওয়া’। তরুণেরা তাদের প্রাত্যহিক বিদ্যালয় জীবনে কী শিখছে তাই মূখ্য বিষয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতা সমাজের জন্যে কল্যাণ বয়ে আনে না।

তবে আমরা কিন্তু প্রতিযোগিতার বিপক্ষে নই। প্রতিযোগিতা হতে হবে সুস্থ। এটা যেন আপনাকে আসক্তি বা অসুস্থ না করে। পবিত্র কোরআনে সূরা মূলকের দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সৎকর্মে কে অগ্রগামী তা পরীক্ষার জন্যেই তিনি জীবন সৃষ্টি ও মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছেন।”

আসলে প্রতিযোগিতা সবসময় হতে হবে নিজের সাথে যে, গতকালের আমির সাথে আজকের আমির। আমি কি আমার পড়াশুনায় আগের চেয়ে আন্তরিক হতে পেরেছি? আমি কি গতকালের চেয়ে ইবাদত ও মেডিটেশনে বেশী মনোযোগ দিতে পেরেছি? আজ আমি নতুন কিছু কী শিখেছি? আগের চেয়ে একটু বেশি কী কষ্ট সহিষ্ণু হতে পেরেছি? আমি কি আমার কাজটা আগের চেয়ে ভালোভাবে করেছি? আমি নিজের প্রবৃত্তিকে গতকালকের চেয়ে আরেকটু কমাতে পেরেছি? আমি কি অন্যকে সহযোগিতা করেছি? অন্যকে কি আমি আজকে আগের চেয়ে বেশি সেবা দিতে পেরেছি?

প্রতিটি মানুষ যদি নিজের সাথে নিজে প্রতিযোগিতা করে তাহলে দেখা যায় প্রতিদিন সে নিজেকে একটু একটু করে ছাড়িয়ে যায়। একসময় দেখা যায় সে খুব সহজেই তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। সহযোগিতা হতে হবে সবার সাথে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা আমাদের মধ্যে না শুকরিয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, আর অন্যকে সহযোগিতা করলে স্রষ্টার রহমত বেড়ে যায়। আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনেও ভালো কাজের জন্যে প্রতিযোগিতা করতে বলা হয়েছে।

তাই ভালো কাজের জন্যে প্রতিযোগিতাটা শুধুমাত্র নীরবেই নিজের সাথে হওয়া উচিত। প্রতিযোগিতা যখন অন্যের সাথে হয় সেটা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলে। কারণ তখন আমরা শুধু নিজের কল্যাণ চিন্তাই করছি। কিন্তু সহযোগিতা আমাদের অন্তরতম সত্ত্বাকে প্রশস্ত করে। আমিত্বকে ভেঙে দেয়। আমাদের চিন্তাগুলো তখন আমি থেকে আমাদের হয়। অন্যের কল্যাণ চিন্তায় কাজ করলে তখন খুব সহজেই আমাদের লক্ষ্য অর্জনও সহজ হবে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, ক্লাসের ভালো ছাত্রটি তার নোটটি লুকিয়ে রাখে, কোনো বিষয়ে ভালো জানলে কোন বই থেকে সে শিখেছে এটা জানাতে চায় না। অথচ সে যে অংকটা বুঝতে পেরেছে তা যদি সে তার সহপাঠীদের বোঝাতে বা শেখাতে যায় তবে তার জানার পরিমাণ কিন্তু আরো বেড়ে যায়।
পেশাগত জীবনেও কিন্তু আমরা দেখি যে, কোনো একটা কাজে একজন দক্ষ। তিনি অন্য কাউকে, বিশেষ করে নতুন কেউ এলে তাকে শেখাতে চান না। অথচ আপনার কাজটা অন্য একজনকে শেখালে আপনা আপনি কিন্তু আপনার চেয়ারটা খালি হয়ে যায়। আপনি আরো ওপরের চেয়ারে চলে যাবেন। কারণ আপনার দক্ষতা আগের চেয়ে আরো বাড়বে।

তাই যারা চাকরিজীবী তারা সহকর্মীকে কখনো প্রতিপক্ষ বানাবেন না বরং তার সহযোগী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করুন। তার সাথে প্রতিযোগিতারও কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ যদি প্রতিযোগী বানান, তাহলে সে আপনাকে পেছনে টেনে রাখবে আর যদি সহযোগী বানান তাহলে পাবেন তার সহযোগিতা।
আমরা যখন প্রতিযোগিতা না করে সহযোগিতা করবো তখন স্রষ্টার রহমত আমরা বাই প্রোডাক্ট হিসেবে এমনিতেই পাবো।

হযরত আলী রা. একটি উক্তি থেকে এ বিষয়টি আরো বেশি সুস্পষ্ট হবে। তিনি বলেছেন, সেই সত্তার শপথ যিনি দুনিয়ার সকল আওয়াজ শ্রবণ করেন, যেকোনো ব্যক্তি যদি কারো মনে আনন্দ দিতে পারে, তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে, আল্লাহ তায়ালা এ আনন্দ দানের পরিবর্তে তার জন্যে মেহেরবানি সৃষ্টি করেন। সে কোনো মসিবতে পতিত হলে আল্লাহর মেহেরবানি তার প্রতি উঁচু স্থান হতে নিচের দিকে প্রবাহিত পানির ন্যায় দ্রুত ধাবিত হয় এবং তার মসিবত এমনভাবে দূর হয়ে যায়, যেমন মালিক শস্যক্ষেত থেকে অন্যের উট তাড়িয়ে দেয়।

নিজের সাথে প্রতিযোগিতা আর সবার সাথে সহযোগিতা এ মনোভাব তৈরি করতে হলে আমাদের প্রতিনিয়ত আত্মপর্যালোচনা করতে হবে নিজের ভুলভ্রান্তি এসকল বিষয়ে সচেতন হতে হবে। যদি রাতে ঘুমাবার আগে নিজের সারাদিনের কাজের পর্যালোচনা করা হয় যে আজ আমি চলায়-বলায়-অর্জনে অবশ্য পালনীয়গুলো ঠিকমতো করেছি কি না তবেই আমদের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

একদিন আমাদের কৃতকর্মের জন্যে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এখন আমরা যদি নিজেরাই এই জবাবদিহি করে ফেলি, তখন স্রষ্টা দেখবেন, বান্দা নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করেছে। কিছু শোধরাতে পেরেছে, কিছু পারে নি। কিন্তু প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে। আর স্রষ্টা কিন্তু এই চেষ্টাটুকুই দেখেন।

আর আমাদের রাতের মেডিটেশনে যদি এই আত্মপর্যালোচনা থাকে তবে আমাদের কাজের ভুল প্রতিনিয়ত স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকবে এবং সাফল্যের পরিমাণ বাড়তে থাকবে। নিয়মিত মেডিটেশন করলে অবচেতনের ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হবে। ফলে অভ্যাসবশত: যে ভুল আমরা করি, অসচেতন ভুলগুলো অবচেতন থেকেই সচেতনতার বলয়ে উঠে আসবে। ফলে নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতায় এবং অপরকে সহযোগিতায় আমাদের অবস্থান অনেক এগিয়ে যাবে। জীবনে প্রথম হওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবো।

প্রধান: পৃষ্ঠপোষক, সম্ভাবনার কলসকাঠী