করোনায় বই বিক্রেতা, মনোহারি-ফটোকপি ও কোচিং বাণিজ্যে ধ্বস

শফিক মুন্সি মঙ্গলবার, জুন ৯, ২০২০ ৫:১৮ অপরাহ্ণ

করোনা সংকটে এলোমেলো হয়ে গেছে দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। সংক্রমণ রুখতে দু’মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যে কারণে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে আছে সকল শিক্ষার্থীরা। আর এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। যাদের মধ্যে আছেন বই বিক্রেতা, মনোহারি (শিক্ষা-সামগ্রী) ও ফটোকপি দোকানী এবং কোচিং – টিউশনি সংশ্লিষ্ট মানুষ। বর্তমানে দুর্দশায় দিনযাপন করা এসব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা তাই সরকারি সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।

বিগত বছর গুলোর এই সময়ে মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক ( এইচএসসি) পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কিংবা ভর্তি প্রস্তুতির জন্য প্রচুর বই কেনে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে একাধিক মনোহারি ও ফটোকপি দোকানে ভীড় লেগে থাকে স্বাভাবিক সময়ে। আর বছরজুড়ে একাডেমিক কিংবা এডমিশন কোচিং সেন্টার গুলোতে শিক্ষার্থীদের দৌঁড়ঝাপের চিত্র চোখে পড়ে আলাদা করে।

তবে এবার করোনা কালের দহনে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট এসব ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়ার যোগাড় হয়েছে।কারণ শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নতুন বই কেনা, শিক্ষা সামগ্রী সংগ্রহ করা কিংবা কোচিং বা টিউশন ক্লাস করা একদমই বন্ধ হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে বরিশাল বিভাগ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট এসব পুঁজিপতিদের কোটি টাকা জলে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প ও ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে যারা এসব ব্যবসায় নেমেছিল তারা বেকার হবার পথে। সাথে সাথে এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কর্মচারীরা পড়েছে নিদারুণ আর্থিক দুর্দশায়।

বরিশাল বিভাগীয় পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি খন্দকার আবুল হাসান। তিনি জানান,বরিশাল বিভাগে তাদের ১৮০০ ও জেলায় ৩৭৩ জন সদস্য বই ব্যবসায়ী রয়েছে। গত ২৬ শে মার্চ লকডাউন (অবরুদ্ধ অবস্থা) ঘোষণার পর থেকে গত দু’মাস জেলার বই বিক্রেতারা দোকান খুলতে পারে নি। স্বাভাবিক সময়ে এসব মাসে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার টাকার বই বিক্রি করতো তারা। সে হিসেবে জেলার বই বিক্রেতারা গত দু’মাসে ২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে লোকসানের এই সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি।

তিনি আরো জানান, প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যদি গড়ে দুজন কর্মচারীও কাজ করে তবে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি। করোনা সংকটে মালিকদের সাথে সাথে তারাও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ বর্তমান সময়ে বই বিক্রি না থাকায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এসব কর্মচারীদের বেতনে।

বরিশাল জেলা পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিকী জানান, মার্চ মাস থেকে জেলার বইয়ের দোকান গুলো দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বর্তমানে কিছু দোকান খোলা আছে।কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধে বই বিক্রিও শূন্যের কোঠায়। মূলধনের টাকা দিয়ে কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া সহ আনুষঙ্গিক খরচ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

পেশাদার বই বিক্রেতাদের এই দুজন নেতাই যৌথভাবে একটি কথাই বললেন। তা হলো, পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতাদের সরকারি ভাবে প্রণোদনা, তাদের ব্যাংক লোনের সুদ মওকুফ ও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দোকান মালিক এবং কর্মচারীদের আর্থিক অনুদান প্রদান না করলে তাদের পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না।

বরিশালের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাসে স্থগিত হওয়া উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় বরিশালে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৩৮ জন। ধরা যাক এদের মধ্যে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বরিশালের বিভিন্ন স্থানে কোচিং করতো। সেক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অন্তত পাঁচ হাজার টাকা করে নিলেও এই সময়ে কোচিং গুলোর বাণিজ্য হতো ২৫ কোটি টাকা।

এর সঙ্গে স্কুল ও কলেজ গুলোর একাডেমিক কোচিং ও টিউশন সেন্টার গুলোর বাণিজ্যের হিসেব করলে কোটির সংখ্যা বাড়বে আরো কয়েকগুণ। করোনা কালীন সময়ে এই উপার্জন থেকে বঞ্চিত বরিশাল বিভাগ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোচিং সেন্টার গুলো। আর এই ক্ষতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এসব কোচিং সেন্টারে চাকরি করা শিক্ষক ও কর্মচারীদের ওপর।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে তাদের অধিভুক্ত কলেজ সংখ্যা প্রায় দুশো। আর বেসরকারি স্কুল ও কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা এর সঙ্গে যুক্ত করলে হাজার ছাড়িয়ে যাবে সংখ্যা। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটির সামনেই একাধিক ফটোকপি ও মনোহারি দোকান থাকে। করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধে বন্ধ হয়ে গেছে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপার্জন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফটোকপির দোকানী মেহেদী হাসান জানান, তাঁর দোকানের উপার্জনে আরো দুজন কর্মচারী সহ মোট তিনটি পরিবার খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারে। গত মার্চের ১৭ তারিখ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, শিক্ষার্থীরাও এখানে নেই। যে কারণে বেঁচা কেনা বন্ধ রয়েছে এতদিন। ঘরে বসেই দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ইত্যাদি দিতে হচ্ছে। মেহেদীর মতো এমন সংকটে আছে এ অঞ্চলের হাজারো মনোহারি – ফটোকপি দোকান মালিক।

এসব ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান জানান, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত সকলের পাশে সরকার সবসময় আছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্র¯থ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেবার ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ণের কাজ চলছে৷ সেটা সম্পন্ন হলে পুস্তক ব্যবসায়ী সহ যারাই সহায়তা পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে সকলের পাশে থাকবে বরিশাল জেলা প্রশাসন।