বরিশালে অঘোষিত কারফিউ, চারিদিকে নিস্তব্দতা

০৭ এপ্রিল ২০২০, ২১:৪৫

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনা ভাইরাস সংক্রমন রোধে বরিশালের প্রশাসন ব্যপক পদক্ষেপ নেয়ায় বিশেষ করে সড়কে মানুষের চলাফেরা বন্ধে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সেই সাথে সন্ধার পুর্বেই ছোটবড় সকল প্রকার দোকানপাট ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সাথে চলছে ঘরে থাকার নির্দেশনা মুলক মাইকিং। সন্ধার সাথে সাথেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘোটা বরিশাল শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেয়।

সড়কে কাউকে পেলেই জবাব দিহিতার মুখে সদুত্তর দিতে না পারলে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। রিক্সা চলাচলের উপরেও নজরদারী রেখে তা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। শহর অভ্যন্তরে যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। যেন ভীতিকর এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে সার্বিক প্রেক্ষাপটে। একমাত্র ঔষধ’র দোকান ও মিডিয়া কর্মীদের বাধে আর কাউকেই সড়কে অথবা ধারেকাছে দেখা যায়নি। প্রবীন একজন ব্যাক্তি এই চিত্রকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পুর্ব দিনের বাংলাদেশের থমথমে পরিস্থিতির সাথে তুলনা করেছেন।

তবে সুশিল সমাজ ও সচেতন নাগরীক মহল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানায়। করোনা ভাইরাস আক্রান্তে এপর্যন্ত বরিশালে ৩ জনের মৃত্যু ও ২২ ব্যাক্তি সংক্রমিত হয়েছে সন্ধেহে তাদের শেবাচিমের করোনা ইউনিটে রাখা হয়েছে। মৃত দুইজনের নমুনা পরিক্ষা করা হলেও তাদের দেহে করোনার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। উভয় রোগী জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।

শহরের নাগরীক জীবনে করোনা নিয়ে সচেতনাতার পাশাপাশি গ্রাম্য জনপদ উপজেলা সমুহের মানুষের মধ্যেও উদ্ধিগ্নতায় নিজেদের চলাফেরা ও কারো সাথে দেখা সাক্ষাতে সীমাবদ্ধতা টেনেছে বাঁচার তাগিদে। সর্বত্রই আতঙ্ক এবং একে অপরের প্রতি সন্ধেহ বাড়ায় পরিস্থিতি এক বিভীষিক্ষাময় পরিস্থিতির যেন প্রতিচিত্র বরিশালে দেখা যাচ্ছে।

প্রশাসনের একটি দ্বায়ীত্বশীল সুত্র জানায়, ৩ জনের মৃত্যুকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন এই ভাইরাস সংক্রমন রোধেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। দোকানপাট ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা রাখার সময়সীমা বেধে দিয়ে শহরের কোন প্রান্তেই চায়ের দোকান সমুহ খুলতে দেয়া হয়নি। সারাদিন সড়কে লোকের উপস্থিতিও কম ছিল। নগরবাসির চিত্ত বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র নগরীর কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী ত্রিশ গোডাউন বদ্বভূমি এলাকায় পুরোই শুণ্য।

গনপরিবহন বলেতে সিএনজি বা হলুদ অটো চলাচল বন্ধ ছিল। কিছু রিক্সা চলাচল করলেও একই স্থানে একত্রিত হয়ে কাউকে দাড়াতে দেয়নি পুলিশ। নগরীর প্রতিটি মহল্লায় এবং সড়কে পুলিশের উপস্থিতি এবং কড়াকড়ি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। বিকেলের পরই পরিবেশ পরিস্থতি গুমোট আকার ধারন করে। পুলিশের মুহুমুহু অভিযানে সকল দোকানপাট পরন্ত বিকেলের আগেই বন্ধ হয়ে যায়।

সড়ক চলাচলরত মানুষকে জবাবদিহিতার আওতার নিয়ে আসতে কখনো ধাওয়া আবার কখনো লাঠির্চাচ করে ঘরমুখি হতে বাধ্য করে। পুলিশের সাথে র‌্যাব ও সাধা পোষাকে ডিবি পুলিশ গোটা নগরীর সড়ক সমুহে অবস্থান নিয়েছে। পুলিশের গাড়ির হুইসেল আর চারিদিকে নিস্তব্ধতায় ঘোটা বরিশাল যেন অঘোষিত কার্ফু জারীর ন্যায় জনশুন্য হয়ে পরেছে। এদিকে প্রশাসনের এই করাকরি পদক্ষেপে মানুষের মধ্যে উদ্ধিগ্ন-উৎকন্ঠা আরো ভড় করেছে।

সন্ধেহ করছে পরিস্থিতি সম্ভাবত ভাল নয় বিধায় মানুষকে বিনা প্রয়োজনে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। অবশ্য বরিশাল সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, জেলার পরিস্থিতি ভয়াবহ না হলেও আগাম প্রস্তুতি মুলক সংক্রমন রোধে সার্বিক পদক্ষেপের অংশই হচ্ছে সচেতনার তৈরীর পাশাপশি মানুষকে ঘরমুখি করতে বাধ্য করা। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত জেলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রয়েছে।

কিন্তু বাকেরগঞ্জ উপজেলার এক নারীর শরীরে করোনা উপসর্গ পাওয়া যাওয়ায় তাকে শেবাচিমে নিয়ে এসে তার পাদ্রিশিবপুর গ্রামস্থ বাড়িসহ আসপাশের আরো ৩টি পরিবারকে লকডাউনের মধ্যে রাখা হয়েছে। উজিরপুর উপজেলার ৫টি বাড়িও লকডাউন করে দেয়া হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। পৌরশহরের মধ্যে এই বাড়িগুলোর অবস্থান। স্থানীয় সুত্রগুলো জানায় বরিশাল শহরে ফল ব্যাবসায়ী , ঐ এলাকার একজন বাসিন্দা বাড়িতে ফিরে সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকদের সরনাপন্নে নিশ্চিত হয় তার দেহে করোনা উপসর্গ রয়েছে।

তাকে দ্রুত শেবাচিম করোনা ইউনিটে রাখা হয়েছে। বরিশাল শহরতলীর তালতলী এলাকার রাড়িমহল গ্রামের বাসিন্দা ইউসুফ আলী সোমবার বিকেলে শেবাচিমের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা যায়। হাসপাতাল সুত্রে জানায় ভর্তির আর্ধ ঘন্টার ব্যবধানে ৫০ উর্ধ্বো এই বৃদ্দের মৃত্যু ঘটে। এর পরই তার বাড়িটি লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। এসব এলাকায় পুলিশের নজরদারী বসানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, নিরবে বরিশালে এই রোগের বিস্তার ক্রমেই ঘটছে বলে অনুমান করা যাচ্ছে।

শেবাচিমে আজ বা আগামীকাল করোনা শনাক্ত করন মেশিন বসানো কাজ সমাপ্ত হলেই এই রোগী সনাক্তে সহায়ক হবে। প্রতিদিনই জ্বর-সর্দি কাশি নিয়ে কেউনা কেউ শেবাচিম বা সদর হাসপাতালে আসছে। কিন্তু কার দেহে এই ভাইরাস বহন করছে এই নিয়ে একে অপরের প্রতি সন্ধেহ বারায় বর্তমানে স্বজনরাও একত্রিত হচ্ছেন না।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ শাহবুদ্দিন খান (পিপিএমবার) জানান, প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে এবং গণসচেতনতায় মধ্যে বরিশাল বাসিকে নিরাপধ রাখতেই জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শীথিলতা আরোপ করতে বাধ্য হতে হয়েছে। এক্ষেত্রে মানুয়ের চলাফেরা সীমিত করায় পুলিশ মাঠে তৎপর থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনা সহায়ক হয়েছে।

জীবন রক্ষার তাগিদে এই দুর্যোগকালীন সময় সকলের সহযোগীতা এবং সমন্বয় প্রত্যাশা করে বলেন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। সতর্কতায় সবকিছুর উপর করাকরি আরোপ করায় পুর্ব ঘোষনা দিয়ে দোকানপাট ও চলাফেরার ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ জানিয়ে দেওয়ায় চারিদিকে নিস্তব্দতা নেমে এসেছে। বরিশাল বাসির অভিমত গত ২ দিনের পরিবেশগত চিত্র মানুষের মাঝে ভীতির জন্ম দিয়েছে, সেই সাথে সচেতনাতাও বেরেছে।