করোনা জ্বরে হোম কোয়ারেন্টিনে গোটা বরিশাল

শাকিল মাহমুদ মঙ্গলবার, মার্চ ৩১, ২০২০ ১২:২৭ অপরাহ্ণ

রাস্তাঘাট জনমানব শূন্য। যানবাহন নেই। নেই পথচারীদের কোলাহল। যেন ‘ভূতুড়ে শহরে’ পরিণত হয়েছে পরিচিত বরিশাল শহর। করোনাভাইরাস আতঙ্কে নিশ্চুপ হয়ে গেছে শহরটি। অনেকেই শহর ছেড়েছেন, অনেকেই শহরে ঘরবন্দি।

জীবিকার তাগিদে বেরোতে হয়েছে কাউকে কাউকে। তবে অলিগলিতে কোথাও কোথাও কিশোর-তরুণদের আড্ডা দেখা গেছে। করোনাভাইরাস বিস্তার ঠেকাতে নগরীর স্কুল-কলেজ, দোকানপাট, শপিংমলের অধিকাংশই বন্ধ রয়েছে। মূল সড়কগুলোতে পুলিশ-সেনাবাহিনীর টহল চলছে।

এদিকে ৩০টি ওয়ার্ড ও ২২৫টি মহল্লার ৫৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের তিনটি থানা নিয়ে সিটি কর্পোরেশন গঠিত। ২০১১ সালের আদমশুমারি বলছে প্রশাসনিক এই এলাকায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৭৮ জন মানুষ বসবাস করেন। আর কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বিগত ৯ বছরে জনসংখ্যা বেড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে।

এতো মানুষের এ শহরে আজ আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে কার্যত অবরুদ্ধ নগরীর বাসিন্দাদের জীবন-যাপন বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তন এসেছে প্রাত্যহিক কাজেও। অনেকেই ঘরে বসে কাজ করার পদ্ধতিতে খুশিও হতে পারছেন না।

নিত্যপণ্যের বাজারের জন্য অনেকে ঝুঁকেছেন অনলাইন শপের দিকে। পাড়ায়-পাড়ায় মাইকে চলছে করোনা সতর্কতার বার্তা প্রচার। নভেল করোনাভাইরাসের ছোবলে সারাবিশ্ব যখন কাঁপছিল, তখনও বাংলাদেশের জনজীবন ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু মাত্র কয়েক দিনেই পাল্টে গেছে চিত্র। স্তব্ধ জীবনে এখন নানা শঙ্কা আর অস্বস্তির উঁকিঝুঁকি। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে অতি সংক্রামক এই ব্যাধি বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে কী পরিণতি ঘটবে- তা নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-আতঙ্ক।

লঞ্চঘাট এলাকার কুলি মহাসিন বলেন, ‘বরিশাল নগরী এখন একটা ভূতুড়ে শহর। করোনাভাইরাস আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর এক অবস্থা তৈরি করেছে। মানুষজন তাদের ঘরে ঘরে বন্দি, কোনো মানুষ রাস্তায় নেই।

এমনটি বেশি দিন চললে করোনায় নয়, না খেয়েই মরতে হবে আমাদের। লঞ্চঘাট বন্ধ রয়েছে। কেউ টিকিট বিক্রি করছে না। আর আমার মতো কোনো কুলিও যাত্রীর অপেক্ষায় লঞ্চঘার্টে বসে নেই।

নগরীর নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা আসাদ রহমান বলেন, ‘করোনার খবর শুনে শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সবাই সাবধানে থাকছি। ঘরে কোনো খাবার নেই। নিরূপায় হয়ে বের হয়েছি। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই যে, আদৌ বাজার গুলোতে সব পন্য পাবো কিনা। সবকিছু বন্ধ থাকলেও ফার্মেসিগুলো খোলা রেখেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জেলখানার মোড় এলাকার এক ফার্মেসি মালিক বলেন, প্রচন্ড ভয় নিয়ে কাজ করছি আমরা। সরকারের নির্দেশ না থাকলে ফার্মেসি বন্ধই রাখতাম। আমাদের এখন ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’

তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে মাস্ক। এ ছাড়া অনেকেই ব্যাকটেরিয়া রোধক, অ্যালকোহল এবং ব্লিচিং পাউডার কিনে মজুদ করে রাখছেন। চৌমাথা এলাকায় দাঁড়ানো দু’টি রিকশার ওপর পা ছড়িয়ে বসেছিলেন দু’জন চালক।

হোসেন নামে একজন বলেন, ভোর ৬টার সময় বের হয়েছি। এখন বাজে ৩ টা। ভাড়া নিছি মাত্র দুইটা। ৭০ টাকা। সারাদিনে ১০০ টাকা ভাড়া মারতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। গ্যারেজের ভাড়াও তো উঠবে না।

আরেক রিকশাচালক খায়রুল আবার ভিন্ন সমস্যার কথা শোনালেন। বললেন, রাস্তার পাশে চায়ের দোকানগুলো পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে লোকজন জড়ো হয় বেশি। একটা ভাড়া মারলে এককাপ চা খাইতে হয়। পানি খাইতে হয়। গরম পড়তেছে। রিকশা চালামু ক্যামনে?

শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে হঠাৎ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তাটাই বেশি। নগরীর পলিটেকনিক কলেজ এলাকার বাসিন্দা শ্রমিক নাজমা বেগম বলেন, দেশে যা শুরু হইছে এতে ছোট বেলায় মুরব্বিগো মুখে একটা কথা শুনতাম “চাচা আপন প্রান বাঁচা”। সেই কথার বাস্তব রূপ দেখছি এখন। যে যার জীবন বাঁচাতে ব্যস্থ।

কোন কাজ নেই। কি করে সংসার চলবে জানিনা। ঘর থেকে বের না হতে ঘোষণা দিয়ে চলছে মাইকিং। এর মধ্যে শহরে ভিক্ষা করতে বের হয়েছেন বৃদ্ধ আবদুল লতিফ। ফাঁকে কথা হয়ে যায় লতিফের সাথে। তিনি বলেন, বাড়িতে স্ত্রী ও এক প্রতিবন্ধী ছেলে রয়েছে তার। তাদের জন্য ভিক্ষা করতে বের হয়েছেন তিনি।

এটিই তার পেশা। ঘরে বসে থাকলে একবেলার খাবারও জুটবে না। রোগে মরার চেয়ে পেটের ক্ষুধার জ্বালায় মরা অনেক বেশি কষ্টের। ঘরে বসে থাকলে খাবার দেবে কে? তাই বের হয়েছি। রোগে মরবো কিনা জানি না, তবে এভাবে যেতে থাকলে পেটের ক্ষুধায় মরে যাব।

ফাঁকা শহরে টহল দিচ্ছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। কেউ কেউ সুরক্ষার পোশাকে, কেউ আবার সাধারণ ইউনিফর্মে। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা সেনাবাহিনীকে নিয়ে নগরীর বিভিন্নস্থানে বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেনটাইনের বিষয়টি তদারক করছেন।

সেনাবাহিনী, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটের বাইরে নগরীতে সক্রিয় ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা। তবে এ কথা সবাই মানছেন যে, এমন “মৃত্যুপুরী” নিকট অতীতে দেখেনি কেউ। সকলের একটাই প্রার্থনা, প্রিয় নগরী তার চিরচেনা রূপ ফিরে পাবে অচিরেই।