বিসিসিতে গৃহকর মূল্যায়নে ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষুব্ধ মেয়র

নিজস্ব প্রতিবেদক সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯ ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

গৃহকর নিয়ে বরিশাল সিটিতে চলছে নানান গুঞ্জন। অভিযোগ উঠেছে নিয়মের বাইরে গিয়ে কর আদায়ের। যার স্থাপনা পরিবর্তন হয়নি তাকেও দেয়া হচ্ছে বর্ধিত কর পরিশোধের নোটিশ। এমন অনিয়মের প্রমান খুঁজে পেয়েছেন খোদ সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ নিজেই। তার অভিযোগ নগরবাসীর কাছে মেয়রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই কিছু অসাধু কর্মকর্তারা এই অনিয়ম করেছেন।

গত শনিবার (১৬ নভেম্বর) শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে ‍একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি’র বক্তৃতা দিতে গিয়ে এমন অভিযোগ করেছেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

এদিকে মেয়রের কাছে ধরা পড়া ‍এমন অনিয়মের কথা অকপটেই স্বীকার করেছেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কর আদায় শাখার প্রধান কর নির্ধারক মোশফেক আহসান আজম। তবে এটা তার নিজ ইচ্ছায় নয়, বরং সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশেই করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

জানাগেছে, ‘তৃতীয় পরিষদের মেয়র আহসান হাবিব কামাল থাকাবস্থায় নগরীর গৃহকর বৃদ্ধি করে একটি রেজুলেশন অনুমোদন করা হয়। যার বাস্তবায়ন করেন চতুর্থ পরিষদের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। পূর্বের পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে গৃহকর কয়েক গুন বেড়ে যায়। যা নিয়ে নগরময় শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালচনার।

বিসিসি’র কর আদায় শাখা সূত্রে জানাগেছে, ‘সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট ৫৩ হাজার হোল্ডিং রয়েছে। যার মধ্যে স্থাপনা পরিবর্তন হওয়া ৩ হাজার হোল্ডিং এর গৃহকর পুনঃ মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়। নতুন করে মাপঝোপের স্থাপনা পরিবর্তন হওয়া ওইসব স্থাপনার ‍আইন অনুযায়ী নতুন কর মূল্যায়নের নির্দেশ দেন মেয়র। কিন্তু সেই নির্দেশনাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেন বিসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কর নির্ধারকসহ কতিপয় সুযোগ সন্ধানী কর্মচারী। তারা নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রতিহিংসা বসত স্থাপনা মালিকদের নতুন গৃহকর মূল্যায়নের আওতায় নিয়ে এসে নোটিশ প্রদান করেন।

সিটি কর্পোরেশনের কর মূল্যায়নের নিয়ম অনুযায়ী যাদের পুরানো স্থাপনা রয়েছে কিন্তু তাদের অবকাঠামো পরিবর্তন হয়নি তাদের নতুন করে কর মূল্যায়ন করা হবে না। যারা স্থাপনা পরিবর্তন করেছে, বিশেষ করে টিনের ঘর থেকে পাকা দালান, এক তলা থেকে দুই তলা বা অবকাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে তারাই নতুন কর মূল্যায়নের আওতায় আসে। এমন ৩ হাজার স্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্টরা। যার মধ্যে বরিশাল সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ’র বাড়িও রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, ‘নিয়মে এক থাকলেও বাস্তবে করা হয়েছে ভিন্নটা। যাদের পুরানো স্থাপনা এবং অবকাঠামো পরিবর্তন হয়নি তাদেরও নতুন গৃহকর মূল্যায়নের আওতায় এনে নোটিশ দেয়া হয়েছে। আবার বাড়ি বা স্থাপনার সামনে নিজস্ব পরিত্যক্ত জমিতে ইট-বালু রেখে ব্যবসা করা ব্যক্তিদেরও নতুন ট্যাক্স মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। সম্প্রতি নগরীর পুলিশ লাইন সংলগ্ন আমবাগান এলাকার বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা মফিজুল ইসলাম ঝন্টুকে নোটিশ দেয়ার পরে ‍এমন অনিয়ম ধরা পড়ে মেয়রের কাছে।

জানাগেছে, ‘মফিজুল ইসলাম ঝন্টু’র আমবাগানের পুরাতন বাড়ির স্থাপনা পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু তার পরেও তাকে নতুন গৃহকর মূল্যায়নের নোটিশ দেয়া হয়। এতে কয়েকগুন বেড়ে যায় তার গৃহকর। বিসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাইল হোসেন, প্রধান কর নির্ধারক মোশফেক আহসান আজম ও এ্যাসোসর কবির হোসেন সোহেল প্রতিহিংসাবসত তাকে এই নোটিশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ’র নিকট অভিযোগ দেন মফিজুল ইসলাম ঝন্টু। ওই অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে মেয়র খুঁজে পান অনিয়মের প্রমান। এর পর পরই মেয়র অন্যান্য আবেদনগুলোও খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কর নির্ধারক মোশফেক আহসান আজম বলেন, ‘আমরা চাকুরি করি। আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের নির্দেশেই এমনটি করা হয়েছে। তবে মফিজুল ইসলাম ঝন্টুকে যে নোটিশটি দেয়া হয়েছে সেটা ভুল বসত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে জরিপ করতে গিয়ে ভুলবসত তিনি সহ আরও বেশ কয়েকজনের নাম সেখানে মূল্যায়নের তালিকায় ঢুকে গেছে। সেটা সমাধান করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শুধুমাত্র স্থাপনার কর আদায় করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু তার স্থাপনার সামনে নিজ জমিতে মালামাল রেখে বিক্রি করলে সে জন্য কর দিতে হবে না। কিন্তু প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেন এর নির্দেশে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের কর মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। যার মধ্যে ১০ নম্বর ওয়ার্ডস্থ চাঁদমারী এলাকায় ১০-১১ জন, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৭-৮ জন, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২-৩ জন এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৫ জন রয়েছে। এদের বর্ধিত কর মূল্যায়নের আওতায় আনাটা সম্পূর্ণ অনিয়ম বলে স্বীকার করেন মোশফেক আহসান আজম। তবে এ অনিয়ম প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশেই করা হয়েছে। তাছাড়া এ বিষয়ে মেয়রের অনুমতি রয়েছে বলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের অবহিত করেন।

নগর ভবন সূত্রে জানাগেছে, ‘বিসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ‍ইসরাইল হোসেন সিটি মেয়রের ‍আস্থাভাজন হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে। আর ‍এ বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেয়রের কালো তালিকায় চলে ‍এসেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। ‍এমনকি অনিয়মের বিষয়টিতে প্রধান নির্বাহীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসরাই হোসেন এর বক্তব্য জানা যায়নি। তবে গত শনিবার শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিমাল প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি’র বক্তৃতা দিতে গিয়ে গৃহকর নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ করেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। এ নিয়ে তিনি অনেকটা ক্ষোভ ঝাড়েন। বলেন, ‘আমাকে বিপদে ফেলতেই কিছু কর্মকর্তা এমন অনিয়ম করেছে। যা এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। জণগনকে ভোগান্তিতে ফেলে কোন অনিয়মের সুযোগ নেই।

তিনি বলন, ‘তদন্ত করে যেটা পেয়েছি সেটা চিন্তার বিষয়। যার শুনানীর কোন ক্ষমতা নেই, সেই কর্মকর্তাও গৃহকর নিয়ে আবেদনের শুনানী করেন। অথচ এ জন্য কাউন্সিলর এবং রাজস্ব কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি রয়েছে। মুলত আমাকে প্রশ্নের মুখে ফলতেই এই অনিয়ম করা হয়েছে। এর কারন আমি মেয়র হয়ে আসায় বিসিসি’র কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমস্যা হয়েছে। যারা বিসিসিকে দুর্নীতির আতুরঘর বানিয়ে রেখেছে।

মেয়র বলেন, ‘বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে অনিময়-দর্নীতি আজকের নয়। ৪০ বছর পূর্বের দুর্নীতি-অনিয়ম এক দিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়। আস্তে ধীরে সব বন্ধ হবে। আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। যে কারনে আমার প্রতি মানুষের ভালোবাসা আদালা। আমার প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে। আমার প্রতি জণগনের চাওয়া একটু বেশিই থাকবে। আমি তাদের চাওয়ার থেকেও বেশি দিব। যেটা মানুষ এখন না বুঝলেও ভবিষ্যতে ঠিকই বুঝতে পারবেন। এ জন্য নগরবাসীকে ধৈর্য্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।