বিএমপিতে থানার সাফল্য ২০ হাজার, আর ডিবি’র অর্জন ৪ পিস

বরিশাল নিউজ শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯

মাদক উদ্ধারে পিছিয়ে পড়েছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) শাখা। চলতি বছরের গত আট মাসে নেই তাদের বড় কোন সফলতা। থানা পুলিশ যেখানে ২০ হাজার পিস ইয়াবার চালান জব্দ করে রেকর্ড সৃষ্টি করছে সেখানে মাত্র চার পিস ইয়াবা উদ্ধারের রেকর্ডও রয়েছে ডিবিতে। গত ১৫ দিনের এক পরিসংখ্যানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

অভিযোগ উঠেছে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে ডিবি’র কতিপয় কর্মকর্তাদের গোপন সংখ্যতা, অভিযানিক টিমের দুর্বলতা এবং দুর্বল সোর্স এর কারনে মাদক উদ্ধারে সফলতা পাচ্ছে না নগর পুলিশের এই শাখাটি। যদিও ছোট ব্যবসায়ীদের দিয়েই মাদকের রাঘব বোয়ালদের কাছে পৌছানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ কমিশনার নরেশ চন্দ্র কর্মকার।

তথ্যনুসন্ধানে জানাগেছে, বর্তমান নগরীতে হাত বাড়ালেই মেলে মরণ নেশা ইয়াবা ট্যাবলেট। মাদক কারবারিরা বিভিন্ন মাধ্যমে চালান সরবরাহ করে তা নগরীর অলিগলিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। পুলিশ এবং র‌্যাব এর তথ্য মতে নগরীতে যেসব চালান ঢুকছে তার বেশিরভাগ বঙ্গপসাগর হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করছে। পরে কুয়াকাটা, বরগুনা এবং পাথরঘাটা হয়ে বরিশাল নগরীতে আসছে। গত ২৭ আগস্ট কোতয়ালী পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া ২০ হাজার পিস ইয়াবার চালান বরগুনা হয়েই বরিশালে আসে বলে জানিয়েছে পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র।

এদিকে দায়িত্বশীল মহলের দেয়া তথ্য মতে মাদক সহ অপরাধ দমনের গুরুদায়িত্ব রয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার ওপর। বিশেষ করে মাদক উদ্ধারে ডিবি’র ভুমিকা বরাবরই বেশি ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই চলতি বছরের শুরু থেকে তাদের সেই সফলতা কমতে শুরু করে। যা বর্তমান সময়ে শূণ্যের কোটায় পৌছচ্ছে। গত ১৫ দিনে ডিবি পুলিশের অভিযান ও মাদক উদ্ধারের চিত্র এমনটাই প্রমান করছে। যদিও মাদক উদ্ধারে পিছিয়ে গেলেও তাদের অভিযান বিগত সময়ের থেকে অনেকটা জোরদার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশে একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার ও ছয় জন ইন্সপেক্টর নেতৃত্বাধীন ৮টি টিম রয়েছে। যার মধ্যে প্রতিদিন চারটি টিম অভিযান করছে। প্রতিটি টিমে একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) এর নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন করে অফিসার-ফোর্স থাকছে। রাত-দিন সমান করে মাদক উদ্ধারে চলে তাদের বিশেষ অভিযান।

তবে সম্প্রতি সময়ের কোন অভিযানেই তারা সফলতা পাচ্ছে না। গত ২০ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ দিনের টানা অভিযানে ৩৩ জনকে মাদক সহ গ্রেফতার করেছে তারা। তবে এদের মধ্যে নেই চিহ্নিত কোন মাদক কারবারি। যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের মধ্যে সেবনকারীর সংখ্যাই বেশি। এদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ৪৩৪ পিস ইয়াবা, ২৭৫ গ্রাম গাঁজা ও ৪২ এম্পুল জি-মরফিন। এর মধ্যে চলতি মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত ২০৭ পিস ইয়াবা সহ গ্রেফতার হয়েছে চার জন।

তথ্য অনুযায়ী গত ২০ আগস্ট নগরীর কলেজ রোড এর একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ৪২ এম্পুল জি-মরফিন সহ বাবা-মেয়ে ও ছেলেকে আটক করেন ডিবি’র এসআই দেলোয়ার হোসেন। তাছাড়া ১৫ দিনের টানা অভিযানে সর্বোচ্চ ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারে সক্ষম হয়েছে ডিবি’র টিম।

এর বাইরে গত ২১ আগস্ট ৪ পিস ইয়াবা সহ কাউনিয়া ব্রাঞ্চ রোড থেকে শাহরিয়ার হাসান আকিব ও মো. রাহাত হোসেন, ২৩ আগস্ট ৫পিস ইয়াবা সহ কাটপট্টি থেকে হাসান মিয়া, সিএন্ডবি ১ নম্বর পুল থেকে ১০পি ইয়াবা সহ মো. সাকিল সরোয়ার, চরমোনাই ট্রলারঘাট থেকে ৭ পিস ইয়াবা সহ মো. মিঠু হাওলাদার, ২৭ আগস্ট কাশিপুর পূর্ব বিল্ববাড়ি এলাকা থেকে ২০০ গ্রাম গাঁজা সহ খাদিজা বেগম, জিয়া সড়ক থেকে ১১ পিস ইয়াবা সহ রমজান মীর, ২৮ আগস্ট ৭ পিস ইয়াবা সহ মো. সিরাজ বক্স ও আমিনুল হাওলাদার, একই দিন বাঘিয়া এলাকা থেকে ৫০ গ্রাম গাঁজা সহ মেহেদী হাসান হাওলাদার ও মো. রাজু হাওলাদার, ২৯ আগস্ট দরগাহবাড়ি এলাকা থেকে ৭ পিস ইয়াবা সহ মো. নিশান সরকার ও মো. সাইদ ফকির, টিবি হাসপাতালের সামনে থেকে ৫ পিস এয়াবা সহ মো. রিয়াজ মৃধা ও ৫ আগস্ট ৭ পিস ইয়াবা সহ লঞ্চঘাট এলাকা থেকে সোহাগ হাওলাদার ও রাসেল সিকদার নামের দু’জনকে আটক করা হয়।

সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, ডিবি পুলিশের নিয়মিত অভিযানের ফলে হাইএক্স মাইক্রোবাস রিকিউজিশন হচ্ছে। সরকারি খরচে পোড়া হচ্ছে জ্বালানি তেল। তার পরে দিন-রাত সমান তালে অভিযান শেষে মাত্র ৪/৫পিস ইয়াবা উদ্ধারের যে সফলতা তুলে ধরা হচ্ছে তা হাস্যকর বলে মন্তব্য করছেন অনেকে।

এদিকে ‘মাদক উদ্ধারে গোয়েন্দা শাখার পিছিয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু কারনকে দায়ি করছেন ডিবি সংশ্লিষ্টরা। যার মধ্যে সোর্স দুর্বলতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে টিম লিডারের দিক নির্দেশনার ঘাটতে রয়েছে বলে মনে করছেন সূত্রগুলো। তারা বলেন, ডিবি’র টিমে দীর্ঘ দিনের পুরানো অফিসার ফোর্স রয়েছে। যাদের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের সখ্যতাও রয়েছে। ফলে রাঘব-বোয়ালদের বাঁচাতে খুচরা ব্যবসায়ী ও সেবিদের ধরে এনে চালান করা হচ্ছে। এসব কারনে মাদক উদ্ধারে বড় কোন সফলতাও পাচ্ছে না গোয়েন্দা শাখা।

যদিও মাদক উদ্ধারে চলামান অভিযান নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার নরেশ চন্দ্র কর্মকার। তিনি বলেন, ‘মাদক উদ্ধারে আমাদের কোন দুর্বলতা নেই। আমরা নিয়মিত অভিযান করছি। সল্প সংখ্যক মাদক নিয়ে যারা ধরা পড়ছে তারা সেবনকারী। ১০/১২ পিস এর ওপরে ইয়াবা সহ যারা ধরা পড়ছে তারা ছোট পাচারকারী। তাদের মাধ্যমে আমরা বড় কারবারিদের কাছে পৌছাবার চেষ্টা করছি। আশা করছি খুব শিঘ্রই গোয়েন্দা শাখা বড় সফলতা অর্জন করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ ২০ হাজার পিস ইয়াবার যে চালান উদ্ধার করেছে সেই চালানের তথ্য আমাদের কাছেও ছিলো। আমাদের টিমও কাজ করেছে ওই ইয়াবা উদ্ধারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমাদের আগেই কোতয়ালী পুলিশ মাদকের গডফাদার সহ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারে সফল হয়েছে। ডিবি’র ঝুলিতেই এমন সফলতা খুব শিঘ্রই আসবে বলে আশাব্যক্ত করেন ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা।