শেষ বারের জন্যও বাবুকে কোলে নিতে পারিনি- শাহানারা আবদুল্লাহ

বরিশাল নিউজ শনিবার, আগস্ট ৩১, ২০১৯

ফজরের আজানের একটু পূর্বে হঠাৎ শব্দে শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এরপর শুরু হয় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষন। দ্রুত আমার স্বামী এবং সন্তান সুকান্ত ও সাদিককে নিয়ে শ্বশুরের (শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত) কক্ষে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই পরিবারের অন্য সদস্যরাও একই কক্ষে অবস্থান করছে। বৃষ্টির মতো গুলি হওয়ায় সেই কক্ষ থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না।

তখন শাশুড়ী (বঙ্গবন্ধুর বোন) শ্বশুরকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, তুমি এখনও কেন বসে আছ। কেন আমার ভাইকে (বঙ্গবন্ধু) ফোন করছ না। পরে আবার ধমক দিয়ে ফোন করতে বললে, তখন শ্বশুর একটাই কথা বললো “তোমার ভাইও (বঙ্গবন্ধু) মনে হয় ওদের থেকে রেহাই পায়নি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাজধানীর মিন্টো রোডের বাস ভবনে ঘটে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃন্যতম ও নিকৃষ্ট ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শাহানারা আব্দুল্লাহ সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। শনিবার (৩১ আগস্ট) নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে ‘শোকাবহ আগস্ট স্মরণে দোয়া ও স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে তিনি তুলে ধরেন সেই নির্মম ঘটনা।

বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর স্ত্রী শাহানারা বেগম বলেন, ১৫ আগস্ট আমাদের এক পরিবারের ১৮ জনকে হত্যা করা হয়। আমার মনে হয়না পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘৃন্যতম ও নিকৃষ্ট ঘটনা কোথাও হয়েছে। যেখানে শিশুদেরও হত্যা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ওই পরিবারের পুত্রবধু হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অনেক স্নেহ আমি পেয়েছি। তবুও বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে কিছু বলার সাহস হতো না। তার সামনে গেলেই সব কিছু গুলিয়ে ফেলতাম। একবার সুকান্ত বাবুকে নিয়ে তার সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাকে তো কিছু বললেন না, সুকান্ত বাবুকে কাছে ডেকে বললেন, দাদা এই বুকটার উপর কিন্তু তোমার বাবা বড় হয়েছে।

শ্বশুর শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সম্পর্কে বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে সাহানারা আব্দুল্লাহ বলেন, আমার শ্বশুর আব্দুর রব সেরনিয়াবাত তিনি একজন পরিপুর্ণ মানুষ ছিলেন। আমি তার কাছ থেকেই রাজনীতি শিখেছি। তিনি আমার রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। ওনার অনুপ্রেরণায় আমি বরিশাল ওমেন্স কলেজের প্রথম নির্বাচিত ভিপি ছিলাম।

শাহানারা আবদুল্লাহ বলেন, খুব অল্প বয়সে আমার বিয়ে হয়েছিলো। তাই বঙ্গবন্ধু এবং আমার শ্বশুর পরিবারের সবাই আমাকে ভালোবাসত। কেননা বঙ্গবন্ধুর পরিবারে একটি নিয়ম ছিলো যে তাদের আত্মিয় স্বজনদের মধ্যেই মামা-খালা-চাচা-ফুফাতো ভাই বোনদের মধ্যে থেকেই বিয়ে হতো। একমাত্র আমিই বাইরের মেয়ে যে বউ হয়ে তাদের পরিবারে যাই। শেখ ফজুল হক মনি আমাকে নিজের বোনের মত মনে করতেন। তিনি দেশের বাইরে কোথাও গেলে ফিরে এসে ছোট জিনিস হলেও এনে আমার হাতের মধ্যে গুজে দিতেন।

১৫ই আগস্টের ভয়াল সেই স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৪ আগস্ট দাদী শাশুড়ীর মৃত্যুবার্ষিকীর দোয়া ছিলো ২৭ নম্বর মিন্টু রোডে। ওইদিন মিলাদ শেষে রাতেই আমাদের বরিশালের ফেরার কথা ছিলো। কোন একটা দূতাবাস থেকে আমার শ্বশুরকে ফোন করে খবর দিলো ওনার সাথে জরুরী আলাপ আছে। তাই ওই আর বরিশালে আসতে দেননি তিনি।

তিনি বলেন, শ্বশুর আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই খাবার শেষে খাবারের টেবিলে দুই ছেলেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু যে বাকশাল করেছেন, তা বাস্তবায়ণ করতে পারলে বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা এবং না করতে পারলে তোমরা কুকুর-শেয়ালের মত বাঁচবা। তুমাদের বাঁচতে দেয়া হবে না। অনেক রাত পর্যন্ত এ কথা শোনাতে গিয়ে বিরক্তবোধ করেছি। তাই মধ্য রাতে আমি রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ি। বুঝতে পারিনি তিনি আর বাঁচবেন না। তাহলে আর কিছুটা সময় বসে ওনার কথাগুলো শুনতাম।

শহীদ জননী শাহানারা বেগম বলেন, ফজরের আজাদের পর নামাজের কিছু সময় আগে বিকট শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। উঠেই শোনতে পাই বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ হচ্ছে। তখন আমি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ সাহেব ও আমাদের দুই সন্তান সুকান্ত বাবু এবং সাদিক আবদুল্লাহকে নিয়ে শ্বশুরের ঘরে যায়। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই পরিবারের সবাই ওই একই ঘরের মধ্যে রয়েছে এবং বাইরে থেকে বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ হচ্ছে।

ঘটনার সময় ফজলুল হক মনি ভাইকে ফোন করলাম। তিনি বলল বাইরে গিয়ে দেখ না ওরা কি পোশাক পড়া। তখন আমি বললাম বাইরে অনেক অন্ধকার বৃষ্টির মত গুলি হচ্ছে। কি করে যাব? তখন আমার শাশুরী ফোন কেড়ে নিয়ে বলেন মনি বাবা আমাদের বাঁচা। এর মধ্যেই সিঁড়িতে বুটের আওয়াজ। কাজের বুয়া লক্ষ্মীর মা দরজা বন্ধ করে দিলেন। স্বামী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ রুমের মধ্যে ছিলেন না। তিনি পাশের রুমে ছিলেন।
দু’তিন মিনিট পরেই আমাদের দরজা ভেঙে হ্যান্ডস আপ হ্যান্ডসাপ বলে ঘরে ঢুকে পড়লো। নির্মমভাবে অস্ত্র দিয়ে পা দিয়ে লাথি মেরে ফেলে দিলো।

আমাদের সবাইকে সিড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামতে ছিলো। গানের দলের ছেলেগুলো অন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠতে ছিলো। তখন ওরা আমার শশুরকে বলেছিলো কাকা আমাদের কি হবে। তখন তিনে বলেছিলেন বাবা আমাদের যা হবে তোমাদেরও তাই হবে।

সিঁড়ি দিয়ে আমি যখন নামতে ছিলাম তখন আমার কোলে ছিলো সাদিক আবদুল্লাহ, আজ যিনি আপনাদের বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। তখন আমার চার বছরের শিশু সুকান্ত আবদুল্লাহ দু’হাত বাড়িয়ে বলে মা মা আমাকে কোলে নাও, কিন্তু সাদিক আবদুল্লাহ কোলে ছিলো তাই সুকান্ত বাবুকে শেষ বারের মত কোলে নিতে পারিনি। তখন আমার ভাসুর শহীদ ভাই ওকে কোলে তুলে নিলো। সবই মনে হয় আল্লাহর ইচ্ছা আল্লাহ’র রহমত।

নিচে নামতে ওরা আমাকে আটকে জিজ্ঞাসা করলো ‘বলো আর কে কে উপরে আছে? তখন আমার শ্বশুর আমার দিকে এমন করে তাকালে যেন তিনি আমাকে বলছে তুমি বলোনা হাসানাত এখানে আছে। তার সেই চোখ-মুখ আজও আমার মনে পড়ে। আমি তখন বললাম ‘আমি বলতে পারি না। কে ভেতরে আছে, বা কে আসছে’। পরে আমি ভেতরে গেলাম। রুমের মধ্যে আমার শ্বশুর বার বার জিজ্ঞাসা করতে ছিলো ‘এই তোমাদের কমান্ডিং অফিসার কে? কে তোমাদের পাঠিয়েছে? বলে আমাদের কোন কমান্ডিং অফিসার টফিসার নেই। এই বলার সাথে সাথে শুরু হলো ব্রাশ ফায়ার।

শহীদ ভাই’র কোলে সুকান্ত বাবু থাকার কারনে ওদের ধারনা ছিলো এটাই হাসনাত আবদুল্লাহ হবে। এ জন্য তার পিঠে পেছন থেকে ব্রাশ ফায়ার করলো। শহীদ ভাই সাথে সাথে আমার সুকান্ত বাবুকে কোলে নিয়ে উপুর হয়ে পড়ে গেলো। আমার শ্বশুরও বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লো। আমিও তার পাশে সোফার ওপর গিয়ে বসলাম। আমার চোখের সামনে দেখছি, কিভাবে সবাই গুলি খেয়ে পড়ে আছে। কেউ কাঁদছে, কাউ কাতরাচ্ছে। আমার একটা ননদ ছিলো বেবী সেরনিয়াবাত, বারে বারে বলছিলো একটু পানি একটু পানি।

এর মধ্যে আমার আরেক ননদ বিউটি যে ১৩টি বুলেট নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। দৌড়ে এসে আমার শ্বশুরকে জড়িয়ে ধরে বললো আরে বাবা কি হয়েছে। কিছু ক্ষণ পরে ওরা আবার আসলো, এসে আবার বৃষ্টির মত ব্রাশ ফায়ার করলো। তখন আমার শ্বশুর মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আমরা যারা বেচে ছিলাম তারা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আমি সাদিক আবদুল্লাহকে বুকে জড়িয়ে আমার শশুরের পিঠের কাছে মাথা দিয়ে লুকিয়ে পড়লাম।

তখন আমার স্বামী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সিঁড়ি থেকে নেমে আসলো। তিনি তখন কোথায় ছিলো তা আমি জানি না। তখন তার চেহারা কেমন ছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। পরে অবশ্য জানতে পেরেছি তিনি যে রুমে ছিলো সেই রুমে একটা ফোন এসেছিলো, যে ফোনে তিনি জানতে পেরেছে শেখ ফজলুল হক মনি সহ কেউ বেঁচে নেই। সে দরজার কাছে দাড়িয়ে একটা কথাই বলছিলো যে আল্লাহ তুমি আমার বংশে বাতি দেয়ার জন্য কিছু রেখো। তাই হয়তো ওরা রুমের মধ্যে ঢুকেও আল্লার অসিম রহমতের কারনে ওনাকে দেখতে পায়নি।

শাহানারা আবদুল্লাহ বলেন, তার পরেই বাইরে থেকে আরেকটি গাড়ির শব্দ পেলাম। তখন যারা মারা গিয়েছিলো তাদের মধ্যে উপর হয়ে শুয়ে গিয়েছিলাম। বুঝছিলাম ওরা আবার আমাদের মারবে। এর মধ্যে হাসনাত সাহেব আসলো। উনি এসে বাবার হাত ধরে দেখছিলো। যখনই তিনি হাতটি ছেড়ে দিলেন তখনই বুঝে গেলাম আমার শ্বশুর আর নাই। তার পরে আমি বললাম যে দেখো আমাকে ধরে একটু সোফায় বসিয়ে দাও। আমি নড়া চড়া করতে পারছিলাম না। কারন আমার শরীরেও গুলি লেগেছিলো। যা আজও শরীরে বহন করে বেড়াচ্ছি। উনি আমাকে হাত ধরে সোফায় উঠিয়ে দেন।

এর মধ্যে রমনা থানার তৎকালিন ওসি সহ পুলিশ এসে পড়লেন। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সাহেবকে বললেন, আপনি কে, তিনি বললেন আমি এ ঘরের বাবুর্চি। তখন পাশ দিয়ে একজন কেঁদে কেঁদে বললেন, ওনি এই পরিবারের বড় সন্তান আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তখন ওসি বললেন স্যার আপনি পালিয়ে যান। ওরা আবার আসতে পারে। ওসি আমাদের দুই-তিনটি জিপে তুলে দিয়ে বললেন, কোথাও থামবে না সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাবে। তখন হাসনাত সাহেব দাড়িয়ে আমাকে একটি কথাই বলছিলো যে, তুমি যদি বেঁচে থাক তাহলে আমার মায়ের খেয়াল রেখ।

তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে যখন গেলাম তখন দেখি আরেকটা জিপ থেকে মনি ভাই’র মাথাটা ঝুলে আছে। তাকে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। আরজু মনিকে নিয়ে গেলো। কে কোথায় আছে, কে বেঁচে আছে, কে মারা গেছে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমার পিঠে হাত দিয়ে দেখি আঙ্গুল পিঠের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। তখন বুঝছি এইতো আমি চলে যাব, এইতো বুঝি আমি চলে যাব।

ওখানে একজন কর্ণেল ছিলেন তিনি অনেক ভালো লোক। তিনি আমাদের ফাস্ট ট্রিটের ব্যবস্থা করলেন এবং অন্যদের অপারেশন থিয়েটারে পাঠালেন। আমি আমার শ্বশুরী, ননদদের নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম। আমি আমার হাত থেকে একটা চুড়ি খুলে দিয়েএকজন আয়াকে দিয়ে বলেছিলাম একটু গ্লুকোজ এনে দাও।

তখন ঢাকা মেডিকেলের আই ওয়ার্ডটা কেবল তৈরী হচ্ছিলো। আমাদের কয়েকটি বেডে সেখানে রাখা হয়। আমাদের মেরেই খ্যান্ত হয়নি। আমাদের পুলিশ পাহাড়ায় রাখা হয়। আমরা চারজনের মধ্যে কেউ দেখা করতে আসতে পারেনি। হয়তো আল্লাহ’র রহমত ছিলো যে আমি জ্ঞান হারাইনি। তাদের দেখে শুনে রেখেছি।
বঙ্গ ভবন থেকে ফোন আসলো। বলল এই মিসেস হাসানাত এর কাছে দাও। ওরা যখন বুঝতে পেরেছে হাসানাত আবদুল্লাহকে ওরা মারতে পারেনি তখন তারা হাসানাত সাহেবকে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলো।

ওরা এভাবে আমাদের নির্যাতন করছিলো। হঠাৎ করে ভোলার বাসিন্দা ক্যাপ্টেন মাজেদ ও সব সময় আমাদের বাসায় আসত খোঁজ খবর নিতো। মাজেদকে দেখে আমি খুব খুশি হলাম। ও বলল চিন্তা করবেন না আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। তখন আমি বুঝতে পারলাম ও ওদেরই লোক। কদিন পরে আসলো কর্ণেল সাহরিয়ার। সে আমার শাশুরীর সাথে অনেক কথা বার্তা বললো। সে আমার শশুরীর কাছে হাসানাত আবদুল্লাহর কথা জানতে চাইলে আমার শাশুরী কথা ঘুরিয়ে ফেলেন।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় ডাক্তার আমাদের রিলিজ ওঠার দিয়ে দিবে। কিন্তু ওরা আমাকে ছাড়বে না। কর্ণেল সাহেব যখন আমার শাশুরীকে এসে বললো উনি অসুস্থ ওনাকে নেয়া যাবে না। ওনাকে ক্যান্টেনমেন্টে নিয়ে চিকিৎসা করা হবে। কিন্তু আমার শাশুরী রাজী হলো না। সে বলে আমরা কেউ ওকে ছাড়া যাব না। সবাই এখানেই থাকবো।

এদিকে ওই ঘটনার পর থেকে আমি আমার সন্তান ও ওদের বাবার কোন খোঁজ পাচ্ছিলাম না। তারা বেঁচে আছে নাকি মারাগেছে তাও জানতে পারিনি। পরে জানতে পেরেছে আমার দুই সন্তান সাদিক আবদুল্লাহ ও তার বোন আমার বোনের কাছে আছে। এর কদিন পরে বরিশালের কাটপট্টি রোডের একটা মেয়ে খুব আস্তে এসে আমাকে কানে কানে বলল, “আপা আপনি চিন্তা কইরেন না। হাসানাত ভাই’র সাথে আমার দেখা হইছে। প্রতিবেশি বন্ধুরা তাকে আশ্রয় দিয়েছে।” তার মাধ্যমে দু’মাস পরে জানতে পারি সে বেঁচে আছে।

শাহানারা বেগম বলেন, অক্টোবরের ২৭/২৮ তারিখ আমাদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলেন। পরে বঙ্গবন্ধুর ছোট বোনের বাসায় নিয়ে আমাদের রাখা হলো। কিন্তু সেখানেও আমরা শান্তিতে ছিলো না। শাশুরী-ননদদের নিয়ে আজ এবাড়িতে কাল ও বাড়িতে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

হঠাৎ করে ছেলে মেয়েদের দেখতে মন চাইলো। তাদের দেখতে বরিশালে ছুটে আসলাম। আমার মা কোন গাড়ির শব্দ পেলেই ওদের ঝাতার মত (গ্রামিন ভাষায় হাপুরা) মধ্যে লুকিয়ে রাখে। কেউ আমার সাথে দেখা করতে আসতে পারত না। যারা আসতো তাদের হয় ধরে নিয়ে যেত, নয় হুমকি দেয়া হয়। পরে বাচ্চাদের নিয়ে পুনরায় ঢাকায় চলে আসি, লঞ্চ যোগে।

ঢাকা হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আহতরা আছেন তাই ভারতে আশ্রয় নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন প্রতিবেশি দেশের সাথে কথা বলে আমাদের সেখানে যেতে বলেন। ১৯৭৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী আমার সাথে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ’র সাথে দেখা হয়। তখন তিনি ছেলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হয়তো তার সন্তান হারানোর কষ্ট ভোলার চেষ্টা করেছিলো।

আজকের এই যে বরিশালবাসির সামনে আমরার জীবনের এই ঘটনা গুলো বললাম কি অত্যাচার কি নিপীড়ন আমাদের উপর করেছে, এরা কারা ? এরা সেই স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা বিরোধী ছিলো সেই গোষ্ঠি। মনে করেছিলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে তার পরিবারকে শেষ করে দিতে। এরা সেই শক্তি। যারা মদদ দিয়েছিলো তারাও আমাদের ভালোভাবে রাখেনি। যারা কিশোর আগামী প্রজন্ম, তাদের কাছে অনুরোধ রইলো আপনারা একটা কথা মনে রাখবেন একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা কিন্তু এখনো বাংলার মাটিতে আছে। সুতরাং আপনারা সবাই সজাগ থাকবেন। আপনারা দেখবেন এদের সামাজিক ভাবে বয়কট করবেন। এবং যাতে কোন রকম এই দেশের কোন ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়ে সাজাগ থাকতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে। এই হত্যাকান্ডের সাথে বরিশালের মানুষও জড়িত আছে।

১৫ই আগস্ট এর ঘটনায় আমি রমনা থানায় একটি মামলা করেছিলোম। অনেকে জমিনে আছেন। আমরা চাইলে বিচার করতে পারতাম। কিন্তু তা না করে বঙ্গবন্ধু কন্যা আইনের মাধ্যমে তাদের শাস্তির বিচার করেছেন। পরিশেষে দীর্ঘ বছর পরে এরকম আয়োজন করায় বরিশাল জেলা প্রশাসনের প্রতি অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সাহান আরা আব্দুল্লাহ।