বঙ্গবন্ধুর খুনি রশিদের দেহরক্ষী আলী এখন আ’লীগ নেতার পার্টনার

বরিশাল নিউজ রবিবার, আগস্ট ২৫, ২০১৯

তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে টাকার বিনিময় ফ্রিডম পার্টি নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। পার্টির কো-চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্ণেল রশীদ না থাকলেও তার শিষ্যরা এখনো বহাল তবিয়তে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিএনপি-জামায়াত ও জাসদের নেতা হয়ে রাজনীতে সক্রিয়।

ফ্রিডম পার্টির অস্ত্রধারী, যাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় লিবিয়ায়। এদের কেউ কেউ নিজেদের আড়াল করতে রাজনৈতিক দলের বাইরে ব্যবসা বানিজ্য করছেন। আবার কেউ ভোল পাল্টে প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা-বানিজ্য করে হচ্ছেন বিত্তশালী। ফ্রিডম পার্টির প্রথম সারির নেতা কর্ণেল রশীদ এর এমনই এক ঘনিষ্ট সহচর দেশ বিরোধীর সন্ধান মিলেছে বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলার গুয়াবড়িয়া ইউনিয়নে।

যাঁর নাম আলী আহাম্মেদ হাওলাদার। তবে নিজ এলাকায় আসল পরিচয় গোপন রেখে নিজেকে আলী কারি নামে পরিচয় করিয়েছেন। তৎকালীন সময়ে এই আলীকে লিবিয়া পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্র চালানো থেকে শুরু করে অস্ত্র তৈরীর কারিগর বানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ফ্রিডম পার্টির কো-চেয়ারম্যান কর্নেল রশিদ। এমনকি প্রশিক্ষণ শেষে আলীকে দেশে এনে নিজের দেহরক্ষী ও তাঁর সকল অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে দেন রশীদ।

বেশ ভালোই চলছিলো আলী হাওলাদারের জীবনযাপন। তৎকালীন সময় ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন আলী আহাম্মেদ হাওলাদার। ১৯৯৬ সালে কর্নেল রশিদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে তাঁর সকল ব্যবসা বাণিজ্য ও সম্পত্তি দেখভালের গুরুদায়িত্বে ছিলেন দেহরক্ষী আলী। সেই সুযোগ কাজে লাগান তিনি। রশিদের বৈধ-অবৈধ অস্ত্রের একটি অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন আলী। যার অংশ বিশেষ সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসকল গোপন তথ্য প্রকাশ পেলে বেকায়দায় পড়ে যান আলী। তাই সু-চতুর আলী আহাম্মেদ হাওলাদার ভোল পাল্টে ৯৬ এর আমলে ঢাকা থেকে পালিয়ে নিজ এলাকায় আশ্রয় নেয়। এলাকায় ফিরেই নতুন কৌশল অবলম্বন করেন তিনি। যার অংশ হিসাবে তৎকালিন হিজলা-মুলাদী সংসদিয় আসনের এমপি মোশারেফ হোসেন মঙ্গুর সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে সখ্যতা গড়ে তোলেন। আর সখ্যতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় কর্নেল রশিদের ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি।

রশিদ দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরে তাঁর প্রাইভেটকারটি ব্যবহার করতো আলী আহাম্মেদ হাওলাদার নিজেই। এমপি মঙ্গুর কোন গাড়ি না থাকায় আলী হাওলাদার তাঁর প্রাইভেট কারটি মঙ্গুকে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেয়। গাড়ির দেয়া নেয়ার সুবাদে তৎকালীন এমপি মঙ্গুর সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় আলীর। সেই এমপির হাত ধরে বিএনপির রাজনীতে প্রবেশ করে আলী। এরপর থেকে আলীকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। হিজলা উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে অবস্থান করে নেন অবৈধ অর্থের দাপটে। এক পর্যায় সাবেক এমপি মোশারেফ হোসেন মঙ্গুর আশীর্বাদে নিজের জন্মভূমি হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের সভাপতির পদটিও পেয়ে যান তিনি।

এর পর থেকেই হিজলা উপজেলায় নিজের নামটি আলী আহমেদ হাওলাদার থেকে কাট-ছাট করে হয়ে যান আলী কারি। বিগত জোট সরকার আমলে তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ট ছিলো গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা। নিজ এলাকায় নারী কেলেংকারীতে বেশ সমালোচিত এই আলী কারি বছরখানেক আগে গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের মাউনতলা মুন্সি বাড়িতে এক বিধবা নারীর সাথে আপত্তিকর অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ে। কিন্তু এলাকার মোড়লদের মাঝে টাকা ছটিয়ে কোনভাবে সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও দল তাঁর এই কু-কর্মের জন্য মুখ ফিরিয়ে নেয়। নারী কেলেংকারীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে আতাত করার অভিযোগে দলের পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় আলী কারিকে। এরপরও থেমে নেই তার কু-কর্মের ফিরিস্তি।

হিজলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন মোল্লা সহ একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, বিগত জোট সরকারের আমলে আমরা আলীর দ্বারা বহুবার হয়রানির শিকার হয়েছি। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার পরেও থেমে নেই আলীর কু-কর্ম। উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে প্রভাবশালী দুই নেতার ছত্রছায়ায় থেকে হিজলা দাবীয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, বঙ্গবন্ধুর খুনির বডিগার্ড হয়েও বর্তমান সরকারের আমলে এলাকার উন্নয়নে কাজের ঠিকাদারী করছেন আলী কারি।

তবে অবাক করা বিষয় হলেও সত্য যে আলী কারির ঠিকাদারি ব্যবসার পার্টনার হচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদের এক নেতা। এলাকাবাসীর ধারণা আলী কারির কাছে এখনো অবৈধ অস্ত্র মজুদ থাকতে পারে। এসব অস্ত্র নোয়াখালি ও চাঁদপুর এলাকার ডাকাত সর্দারদের কাছে ভাড়া দিয়ে থাকেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর খুনী কর্ণেল রশিদ ও তার মেয়ের সাথে আলী’র এখনো যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি অনেকের। এসব কিছুর পরেও এলাকায় দাপটের সাথেই চলছে আলী কারির ঠিকাদারি কাজ ও সরকার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকান্ড।

তবে এসব অভিযোগ পুরোই ভিত্তিহিন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আলী আহম্মেদ হাওলাদার ওরফে আলী কারি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আমি কখনই বঙ্গবন্ধু’র খুনি কর্ণেল রশিদের লোক ছিলাম না। তবে কর্নেল রশিদের মালিকানাধীন গার্মেন্টসে চাকরি কারতাম। তাও সব কিছু না জেনে। যখন যেনেছি তখন আর চাকুরি করিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার এবং ষড়যন্ত্র করছে বলে পাল্টা অভিযোগ করেন তিনি।

তবে স্থানীয়রা তার এমন দাবি এবং অভিযোগ ভিত্তিহিন বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সকল অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসবে। বরং আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার কাছ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলেও দাবি স্থানীয়দের।