“নেতা যেমন কর্মী তেমন”

বরিশাল নিউজ বুধবার, আগস্ট ১৪, ২০১৯

একজন প্রকৃত নেতা কখনই কর্মীদের ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল করিয়ে নেয়ার তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না। কর্মীদের এমনভাবে গড়ে তোলেন, যাতে তারা ভবিষ্যতে নেতার অবস্থানকেও অতিক্রম করতে পারেন। ভালো নেতা আর যে তত্ত্বে বিশ্বাস করে থাকেন, তা হলো ‘গ্রেট মাস্ট কাম বিফোর গ্রেটনেস’। মহৎ কিছু অর্জন করতে হলে নেতাকে কর্মীর প্রশংসা করতেই হবে।

নেতা নিছক একজন ‘বস্’ নন। তাকে হয়ে উঠতে হবে কর্মীদের ‘ফ্রন্ড ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড।’ যে কর্মীদলটি পরিচালনার দায়িত্ব নেতার হাতে রয়েছে, সেখানে কোন কর্মী কেমন, দলটির আদর্শ বৈশিষ্ট্য -সব কিছুই নেতাকে মাথায় রাখতে হবে। এসব উপলব্ধি করতে পারলে নেতা হিসাবে দলগত ঐক্যকে বজায় রাখা সম্ভব হয়। স্যামুয়েল জনসনের মতে, ‘কোনো নেতার প্রশংসা কর্মীকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।’ অতীতের প্রতিটি সফল নেতা জানতেন – তার কী চাই, কেন চাই, কেমন করে কর্মীদের সাহায্য অর্জন করতে হবে।

কাঠের ঘর থেকে হোয়াইট হাউস, সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন থেকে ফ্রান্সের একচ্ছত্র সম্রাট, কর্মী থেকে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় সাফল্য খুঁজতে যাওয়া ব্যারিস্টার থেকে বিশ্বের স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতির জনক -অর্থাৎ জর্জ ওয়াশিংটন নেপোলিয়ন, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু – মূলত এই সব অন্যান্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের ক্যারিশমাকে ঘিরেই মানুষের মনে গড়ে উঠেছে নেতৃত্ব সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা। এঁরা যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন, তাতে এঁদের প্রত্যেকেই কি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী? না মোটেই নয়।

এসব প্রবাদপ্রতিম নেতারা যেটা করেছিলেন, তাহলো-তাঁরা নিজেদের ধাপে ধাপে আবিষ্কার করেছিলেন। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর যাতে তাঁদের মতবাদ প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সে ভাবেই তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছিলেন। অশান্ত পরিবেশের মধ্যেও তাঁরা নিয়মানুবর্তিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো নেতা ছিলেন না। প্রত্যেকেই অসামান্য গুণের অধিকারী ছিলেন। কাল মহাকাল প্রমাণ করে দিয়েছে, নেতৃত্ব দেয়ার প্রশ্নে তাঁদের অসামান্য দক্ষতার কথা। জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, এসব নেতা সব সময়ই ‘হাজির’ হয়েছেন নিজেরা অনেক কিছু সহ্য করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে। যখনই দেশে দেশে নেতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী হয়েছে, তখনই কেউ না কেউ ‘জন্ম’ নিয়েছেন। কোন জাদুমন্ত্রের বলে তাঁরা এ সমস্ত গুণ অর্জন করে নেতা হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেননি। নেতৃত্বের সঠিক সংজ্ঞাই বা কি? কর্মী যতই নিজেকে উন্নত করে আরো পরিণত হয়ে উঠবেন নেতাকে ততই নিজের ভুমিকাকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে ফেলতে হবে।

নেতাকেই ঠিক করে নিতে হবে তিনি কেমনভাবে চলবেন, কি কাজ করবেন, নেতাকে কিন্তু সেই সমস্ত কাজের দায়িত্বই নিতে হবে, যা অধস্তন কর্মী নিজে করে ফেলতে পারছেন না। কর্মীকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যেই নেতাকে নেতৃত্বের কৌশল স্থির করে নিতে হবে। কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নেতার ভুমিকা পালন করার ক্ষেত্রে সব সময়ে একটি নির্দিষ্ট ক্রম বজায় রাখা সম্ভব নয়। কারণ সব সময়ে সব কর্মীর কাজের পরিণতি একই ভাবে হবে না। আবার ঘটনাপ্রবাহের ওপরও তার কাজ শেখার বিষয়টি নির্ভর করতে পারে। আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে, বিভিন্ন কর্মীর জন্য বিভিন্ন পন্থা’- এটিও যেমন সত্যি, তেমনি ‘একই কাজের জন্য বিভিন্ন পন্থা’ অনেক সময়েই মনে চলতে। দুটিই চিরন্তন সত্য।

কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, দক্ষতা, মেধা,জ্ঞান প্রতিভা, ক্যারিশমা এবং জনপ্রিয়তা থাকলেই অবিসংবাদিত নেতা হওয়া যায়না। যেমন অবিভক্ত বাংলায় শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীর এসব গুণ ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এই গুণগুলোই নেতৃত্বের শেষ কথা নয়।

সার্বিকভাবে একটি পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য এগিয়ে নেয়ার জন্য কর্মী সাধারণকে প্রভাবিত করাই তো নেতার নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য, যা মহাত্মা গান্ধী, জিন্নাহর পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের মধ্যে ফুটে ওঠে। নেতৃত্বের অর্থ হলো ঐকমত্য গড়ে তোলার ক্ষমতা এবং অভিন্ন লক্ষ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। একজন নেতা দল পরিচালনায় তাঁর দর্শনের প্রতি পুরোপুরি দায়বদ্ধ। সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য নেতা নিজের অনুগামীদের অনুপ্রানিত করেন। অনুগত অধস্তন কর্মীদের কোনো ধ্যানধারণা থাকলে নেতা সেগুলো ভালোভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেন। কোনো কর্মীর দক্ষতা কোনখানে, তা বোঝার মতো সুক্ষ্ম অনুভূতি নেতার থাকতে হয়। তাদের স্বাভাবিক দক্ষতা বা ঝোঁক কোনদিকে, সেটাও তাকে বুঝে নিতে হবে।

এছাড়া, নেতাকে যেটা সব সময় ধরে নিতে হবে, তা হলো – অনুগামীরা সবাই তাঁর সঙ্গে কাজ করছে, তাঁর জন্য কাজ করছেন না। নেতা একজন নিছক কোনো বস্ নন। যে কর্মী-দলটি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর হাতে রয়েছে, সেখানে কোন কর্মী কেমন, দলটির বৈশিষ্ট্য -সব কিছুই তাকে মাথায় রাখতে হবে। একজন ভালো নেতা কখনই ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল করিয়ে নেয়ার তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না। অবাস্তব একটি ধারণা রয়েছে, নেতা হয়েই অনেকে জন্মান, নেতা কখনোই তৈরি করা যায় না। ফিল কুইগলের মতে, নেতৃত্ব কোনো পদমর্যাদা থেকে আসে না।। নেতৃত্ব কোনো দক্ষতাও নয়। নেতৃত্ব একটি সম্পর্ক। যে সম্পর্ক মানুষকে সঠিক কাজটি করতে অনুপ্রাণিত করে। অপরের কাছ থেকে দুটিই অর্জন করা যায় সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে। আর এই সম্পর্ক পারস্পরিক আদান-প্রদানের।

চৌত্রিশতম মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার নেতা ও নেতৃত্বের সংজ্ঞা সম্পর্কে বলেছেন- ‘আপনি যেমনটি চান, অপরকে দিয়ে ঠিক সেই কাজটি এমনভাবে করিয়ে নিতে হবে, যাতে তিনি স্বেচ্ছায় কর্তব্যপালন করেন।’ মানবচরিত্রের দুটি মূল প্রবণতার কথা বলেছেন তিনি। একটি হলো প্রভাববিস্তার করা, অন্যটি আস্থা। একটি অন্যটির সঙ্গে পরস্পর সম্পৃক্ত।

 

লেখক: সোহেল সানি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট