ফ্রিতেও চামড়া নিতে নারাজ পাইকার: খুচরা ব্যবসায়ীরা হতাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক মঙ্গলবার, আগস্ট ১৩, ২০১৯ ৪:৪২ অপরাহ্ণ

বরিশালে কোরবানীর পশুর চামড়া নিয়ে হশায় ভুগছেন মৌসুমী ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তারা আশাব্যঞ্চক মূল্য পাচ্ছেন না পাইকারদের কাছ থেকে। ফলে চামড়ার বাজার থেকে হতাশ হয়ে ফিরেছেন অনেকেই। বিশেষ করে মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া কেনা মৌসুমী ব্যবসায়ীরা রয়েছেন লোকসানে। তারা মুলধন হারানোর আশায় নামমাত্র মূল্যেই বিক্রি করছেন গরুর চমড়া। তবে ছাগলের চামড়া ফ্রিতেও নিচ্ছে না পাইকাররা।

অবশ্য চামড়ার বাজারে বর্তমান পরিস্থিতি’র জন্য ট্যানারি মালিকদের দায়ি করেছেন বরিশালে চামড়ার পাইকাররা। তাদের অভিযোগ লাখ লাখ টাকা বকেয়া ও চামড়া সংগ্রহে ট্যানারি মালিকদের অনুৎসাহের কারনেই এবার কোরবানীর চামড়া সংগ্রহ করতে অনাগ্রহী পাইকাররা।

মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) সরেজমিনে ঘুরে দেখাযায়, আগের মত কর্ম ব্যস্ততা নেই নগরীর পদ্মাবতীর চামড়াপট্টিতে। অনেকটা ফাঁকা চামড়াপট্টির বেশিরভাগ পাইকারের গদিতেই তালা ঝুলছে। তিন চারটি গদি খোলা থাকলেও নেই কর্ম ব্যস্ততা এবং মাঠ পর্যায়ের চামড়া ব্যবসায়ীদের পদচারনা। সল্প সংখ্যক চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যস্থ হয়ে আছেন কয়েকজন শ্রমিকরা।

তবে দেখা মিলছে না চামড়ার পাইকারদের। নগরীর বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে নিয়ে আসা চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি দু-একজন খেটে খাওয়া মানুষ কয়েকটি চামড়া নিয়ে আসলেও দেখা মিলছে না মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের। তার মধ্যে কাঁচা চামড়ার মূল্য শুণে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন চামড়া নিয়ে। কেউ কেউ চামড়া বিক্রি করতে পারলেও আশানোরুপ মূল্য না পেয়ে বিমুখ হয়ে ফিরছেন।

বরিশালে কোরবানীর চামড়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাইকারদের কাছে… বিএসএল নিউজ।

চামড়া বিক্রি করতে আসা কয়েকটি মাদ্রাসা ও ইতিমখানার শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এবারে চামড়ার বাজার খুবই মন্দা যাচ্ছে। এক সময় যেখানে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় চামড়া কিনতে হতো সেখানে এবার ১৮০ টাকার ওপর চামড়ার দর ওঠেনি। তাছাড়া এবার যারা কোরবানী দিয়েছেন তারাও চামড়ার মূল্য না টাকার পরিবর্তে মাদ্রাসা ও এতিমখানায় চামড়া দান করেছেন।

মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ বলেন, ১২০ থেকে ১৮০ টাকায় কেনা চামড়া পাইকারদের কাছ বিক্রি করে ২শ থেকে আড়াইশ টাকা মূল্য পেতেই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা পিস হিসেবে চামড়া কিনলেও পাইকাররা গড়ে দম বলে নিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে ছাগলের চমড়াতো নিচ্ছেই না। কোরবানীর দিন বিকেল পর্যন্ত চামড়ার কিছুটা চাহিদা থাকলেও সন্ধ্যা হওয়ার পরই সেই চাহিদা কমে যায়। আর কোরবানীর দ্বিতীয় দিন সেই চাহিদা একেবারেই নেই বললেই চলে। ফলে অধিকাংশ মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

শহরের পদ্মাবতী চামড়াপট্টির পাইকারী ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, চামড়া ব্যবসায় এখন আর আগ্রহী নন পাইকাররা। আমরা কয়েকজন পাইকার ধার দেনা করে মৌসুমী ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার লোকেদের কাছ থেকে চামড়া কিনছি। তবে আশানোরুপ মূল্য না পেয়ে অনেকেই মৌসুমী ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি না করে চলে গেছে।

তিনি বলেন, গত বছরও ধার দেনা করে ১০ হাজার পিস এর মত চামড়া কিনেছিলাম। তার টাকা এখনো ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আদায় করতে পারিনি। এবার ঢাকা থেকেই আমাদের চামড়া না কেনার জন্য অনুৎসাহিত করেছে। তাই এবার বেশি হলে চার হাজার পিস চামড়া কিনেছি। তাও বেশিরভাগ মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং মৌসমী ব্যবসায়ীদের মূল্য পরিশোধ করতে পারিনি। তাদেরটা বাকীর খাতায় লিখে রেখেছি।

বরিশালে বিক্রি না হওয়া কোরবানীর পশুর চামড়া এভাবেই ফেলে রাখা হয়… বিএসএল নিউজ।

পাইকার নাসির উদ্দিন বলেন, ঈদের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আকার-আকৃতি ভেদে প্রতিপিস গরুর চামড়ার মূল্য ২ থেকে ৩শ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। তবে ছাগলের চামড়া টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব হয়নি। কেননা কেনার পরে লবন দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সংরক্ষণ করতে গিয়ে প্রতিটি চামড়ার পেছনে আরো ৩শ টাকা খবর হচ্ছে। এর পর বরিশাল থেকে ঢাকায় পৌছে দিতে পরিবহন খরচও রয়েছে। কিন্তু ঢাকা থেকে যে দর বলতে তাতে আমাদের লোকসান নিশ্চিত। তার মধ্যে ছাগলের চামড়া ৪০ টাকার ওপর দিতে চাচ্ছে না ট্যানারি মালিকরা। যে কারনে ছাগলের চামড়া কেনাটাই বোকামীর কাজ।

তিনি বলেন, অনেকেই গরুর সাথে ছাগলের চামড়া নিয়ে আসছে। কিন্তু এগুলো কিনছি না। ফলে তারা চামড়াগুলো ফেলে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে আমরা লবন বা শ্রমিক খাটাচ্ছি না। শেষ পর্যন্ত এগুলো ফেলে দেয়া ছাড়া কোন কাজে আসবে না বলে জানিয়েছেন পাইকার নাসির উদ্দিন।

এদিকে চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহীদুর রহমান শাহিন বলেন, ট্যানারি মালিকদের কারনেই আজ বরিশালে চারড়া ব্যবসা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে। তাদের কাছে বরিশালের পাইকাররা লাখ লাখ টাকা পাওনা। প্রতি বছর কোরবানীর পূর্বে কিছু টাকা পরিশোধ করলেও এবার খালিহাতেই ফিরিয়ে দিয়েছে পাইকারদের। তাই নতুন করে দেনাগ্রস্থ হতে রাজি নন বলেই বেশিরভাগ পাইকার এবার চামড়া কিনতে অনাগ্রহী।

তিনি বলেন, এক সময় বরিশালে ২০ থেকে ২০ জন চামড়ার পাইকার ছিলো। কিন্তু সেই সংখ্যা কমে এখন ৬/৭ জনে দাড়িয়েছে। যার মধ্যে এবার চামড়া কিনছে মাত্র ৩/৪ জন। আমি (শাহীন) সহ বাকিরা চামড়া কেনা থেকে বিরত রয়েছি। চামড়ার দর উর্ধ্বমুখি না হওয়ায় এবং পাইকারদের মূল্য পরিশোধ না করা হলে আগামীতে বরিশালের কোন পাইকারই চামড়ার ব্যবসা করবে না বলে দাবী চামড়া ব্যবসায়ীদের।