ভবিস্যৎ অনিশ্চয়তায় বরিশাল বোর্ডের ১৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর

নিজস্ব প্রতিবেদক শুক্রবার, আগস্ট ৯, ২০১৯ ৩:১০ অপরাহ্ণ

২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশ নেয়া ১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। একই সাথে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের নামে এক পরীক্ষার্থীকে কক্ষের মধ্যে আটকে মারধরের অভিযোগও করা হয়েছে বোর্ড কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

বোর্ড কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালীর কারনে ওই ১৮ শিক্ষার্থীর ভবিস্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আজ শুক্রবার (০৯ আগস্ট) বেলা ১২টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেছেন ফলাফল আটকে থাকা ১৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবকরা।

তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহিন বলে দাবী করেছেন বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস। তার দাবী একটি চক্রের মাধ্যমে অসদ উপায়ে ১৮ শিক্ষার্থী পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েছে। এজন্য বোর্ডের এক কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্তও করা হয়েছে। চক্রটিকে বাঁচাতেই সংবাদ সম্মেলন করে মিথ্যাচার করা হয়েছে অভিযোগ বোর্ড চেয়ারম্যানের।

এর আগে প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অভিভাবক মাহবুব আলম বলেন, ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই এইচএসসি (সেশন ২০১৭-১৮) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমাদের ১৮ জন সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত রাখা হয়। এজন্য ফলাফল প্রকাশের আবেদন জানিয়ে গত ১৮ জুলাই বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন জানাই।

এর প্রেক্ষিতে ২৪ জুলাই বোর্ডের আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভা পরবর্তী ১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে আশ্বস্থ করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. আনোয়ারুল আযিম। কিন্তু সভা পরবর্তী ২৫ জুলাই বোর্ডের ওয়েবসাইটে ১৮ শিক্ষার্থীর ফলাফল পূর্বের ন্যায় স্থগিত (উইথেলড) দেখা যায়। এজন্য পুনরায় বোর্ডে যোগাযোগ করা হয়।

এদিকে ১৮ শিক্ষার্থী’র উচ্চতর গনিত পরীক্ষায় একই ফলাফল আসার বিষয়টিতে বোর্ড কর্তৃপক্ষের সন্দেরহের সৃষ্টি হয়। এমনকি এ বিষয়ে প্রধান পরীক্ষাক মো. শহিদুল ইসলাম বোর্ডে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত বোর্ড গঠন করা হয়। যেখানে গত ৫ আগস্ট ১৮ শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে, ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা হতে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বোর্ড চেয়ারম্যান, বোর্ড সচিব ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। উচ্চতর গনিত প্রথম পত্রে তারা ১৮ জন পরীক্ষার্থী কেন অধিকতর নম্বর পেলো, কিভাবে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবং বোর্ড সংশ্লিষ্ট কোন কর্মকর্তার সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা সে বিষয়ে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ অস্বীকার করলে তাদেরকে বোর্ড চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি এবং হুমকি দেয়। এমনকি তারা জোর করেই বোর্ডের অফিস সহকারী গবিন্দ’র নাম বলতে বাধ্য করেন। তা না করলে ১৮ শিক্ষার্থীর ফলাফল বাতিল করার হুমকি দেয়।

শুধু তাই নয়, ফলাফল স্থগিত থাকা নুসরাত কবির নামের বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের এক ছাত্রীকে চেয়ারম্যানের বিশেষ কক্ষে নিয়ে মারধর করে। এমনকি ওই ছাত্রীকে অফিস সহকারী গবিন্দর’র বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনে সহযোগিতা করার বিষয়ে জোরপূর্বক লিখত রাখে। তাছাড়া সর্বশেষ ৮ আগস্ট স্থগিত রাখা ফলাফল প্রকাশের কথা থাকলেও অদ্যবদি তা প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।

তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, অভিভাকরা সংবাদ সম্মেলন এমনকি চাইলে আইনী সহায়তাও নিতে পারেন। কিন্তু আমরা বোর্ডের আইনের বারে যাব না। দুষ্ট চক্রের মূল উৎপাটন করে ছাড়বো।

তিনি বলেন, যে ১৮ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা গুরুতর। তারা অসদুপায়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এ বিষয়ে অনেক তথ্য প্রমান আমাদের হাতে এসে গেছে। কেননা অপরাধী অপরাধ করে কোন না কোন চিহ্ন রেখেই যায়। ওই ১৮ শিক্ষার্থীর বেলায় একই হয়েছে।

তিনি বলেন, যে ১৮ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে তারা বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু কাকতালিয়ভাবে ওই ১৮ জনের পরীক্ষার খাতাই যে কোন একজন পরীক্ষকের হাতে পৌছেছে। এটা বোর্ডের কারোর সহযোগিতা ছাড়া করা সম্ভব না।

তাছাড়া ১৮ জন পরীক্ষার্থীর উচ্চতর গনিত প্রথম পত্রের উত্তরপত্রের বিশেষ স্থানে একই ধরনের দাগ দেয়া রয়েছে। তাছাড়া প্রতিজনের খাতার সাথেই লুজ শিট রয়েছে। যা মুল উত্তরপত্রের সাথে পিনআপ বা রশি দিয়ে বাধা থাকবে। কিন্তু তেমনি করে পাওয়া যায়নি। লুজশিট গুলো আলাদা পাওয়া গেছে। এমনকি তাতে পিন মারা বা রশি দিয়ে আটকার কোন চিহ্নও নেই।

তিনি আরো বলেন, উচ্চতর গনিতে পরীক্ষার্থীরা যে অংক করেছেন তার মধ্যে একটি অংক নুসরাত নামের এক ছাত্রীকে পুনরায় করে দিতে বলা হয়। যতটুকু পারে ততটুকু করতে বলা হয় তাকে। কিন্তু ওই শিক্ষার্থী তাও করে দেখাতে পারেনি। এ থেকে বোঝা যায় ওই অংক সে করতে পারেনি। সুতরাং এর পেছনে অন্য কারোর হাত থাকতেই পারে।

শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া বলেন, এটি ¯্রফে গুজব। ওই মেয়েকে আমি মা বলে ডেকেছি। ওকে নিজের মেয়ে বলে সম্বোধন করেছি সত্য ঘটনা বের করার জন্য। ওর গায়ে হাত দেয়ার প্রশ্নই আসে না। মুলত এখন ষড়যন্ত্র চলছে। কোন ষড়যন্ত্রই অপরাধিদের বাচাতে পারবে না। তামের মুল উৎপাটন করা হবে।

পাশাপাশি যে ১৮ শিক্ষার্থী অসদ উপায় অবলম্বন করে অপরাধের সাথে সামিল হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিধি মোতাবেক তাদের ওই পরীক্ষা বাতিল সহ আগামী ৩ বছরের জন্য পরীক্ষা থেকে বহিস্কারের বিধান রয়েছে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার চক্রের সদস্য বোর্ডের অফিস সহকারী গবিন্দকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।