বরিশাল-ঢাকা রুটে লঞ্চ ভাড়া ২০ ভাগ বৃদ্ধি, তার পরেও ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক শুক্রবার, আগস্ট ৯, ২০১৯ ১০:৩২ অপরাহ্ণ

ঈদ উৎসব পালন করছে স্বজনদের কাছে ছুটতে শুরু করেছে বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। আর এ সুযোগে প্রতিবারের মত এ বছরও ২০ ভাগ ভাড়া বৃদ্ধি করেছে ঢাকা বরিশাল নৌ রুটের লঞ্চসহ অভ্যন্তরিন রুটের লঞ্চগুলো। যা গলাকাটা হয়ে দাড়িয়েছে যাত্রীদের। গতকাল বৃহস্পতিবার ঈদ স্পেশাল সার্ভিস থেকে এই ভাড়া কার্যকর হয়। যদিও লঞ্চ মালিকদের দাবি ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। ঈদ উপলক্ষে সরকারি রেট কার্যকর করা হচ্ছে মাত্র। ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি অধিকহারে বাড়ছে জীবন ঝুকির মাত্রা। ধারন ক্ষমতার দ্বিগুন-তিনগুন বেশী যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ঘাট ত্যাগ করলেও নিরব বিআইডব্লিইটিএ কতৃপক্ষ।

জানা গেছে, সারা বছর রাজধানী থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলোয় ডেকের ভাড়া ২০০ টাকা নেয়া হয়। আর সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া নেয়া হয় ৯০০ এবং ডাবল কেবিন ১৮০০ টাকা। ভিআইপি কেবিনের ভাড়া নেয়া হয় প্রকারভেদে ৩-৫ হাজার টাকা। কিন্তু ঈদ এলেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অজুহাত তুলে মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন। সে অনুযায়ী এবারও সরকার নির্ধারিত রেটের অজুহাতে বৃহস্পতিবার থেকে ঈদ স্পেশাল সার্ভিসে ডেকের ভাড়া ২৫০ টাকা, সিঙ্গেল (এসি/নন-এসি) ১১০০ এবং ডাবল (এসি/নন-এসি) ২২০০ টাকা এবং ভিআইপি কেবিনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬-৭ হাজার টাকা।

ঈদ উদযাপন করতে ঢাকা থেকে বরিশালে আসা প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা নামে এক লঞ্চযাত্রী জানান, লঞ্চ মালিকরা দুই ধরনের রেট দিয়ে যাত্রীদের হয়রানি করছেন। প্রতিবছরই তারা এভাবে প্রতারণা করেন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান ও সুন্দরবন লঞ্চ মালিক সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নেই না। তবে স্বাভাবিক সময়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নিয়ে থাকি। ঈদের সময় সদরঘাট বা বরিশাল লঞ্চঘাটের এক প্রান্ত থেকে যাত্রী ছাড়াই ফিরতে হয়। তাই এ সময় সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে থাকি।’

বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, ঈদে ভাড়া বেশি নেয়া হয় না। তবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি নেয়া হয়। তারপরও সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেয়া হচ্ছে। এরপরও যদি কোনো অভিযোগ আসে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।

ঢাকা বরিশাল নৌ রুটে নিয়মিত চলাচলকারী এমভি সুরভী-৭ এর ধারন ক্ষমতা ১ হাজার ২০৫ জন, পারাবত-৭ এর ৭৫০ জন, পারাবত-২ এর ১ হাজার ৫ জন, কালাম খানে ৯শ, কামাল- ১ লঞ্চে ৭১৫ জন এবং কীর্তনখোলা-২ লঞ্চে ১ হাজার ১৩০ জন যাত্রীর ধারন ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েই এই ধারণ ক্ষমতার স্কেল ভেঙে ফেলে। আর ঈদে ধারণ ক্ষমতার কোন বালাই থাকে না। লঞ্চে তিল ধারণের জায়গাও থাকে না। এ সময়ে দেখা যায় লঞ্চের ছাদ থেকে কেন্টিনের মধ্যেও যাত্রী পরিবহন করা হয়। এমন অবস্থায় হাজার হাজার যাত্রীর তীব্র জীবনের ঝুকি নিয়ে লঞ্চগুলো চলাচল করছে।

নৌযানে কর্মরত একাধিক মাষ্টার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের সময়ে বাড়তি যাত্রী চাহিদা থাকার কারণে বেশী যাত্রী পরিবহন করা হয়। তবে কোন কোন সময়ে তা ঝুকিপূর্ন পর্যায়ে চলে যায়। বেশী যাত্রী পরিবহন হলেও এ সকল নৌ-যানে নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীদের জীবন রক্ষার সরঞ্জামাদি নেই। এমভি পারাবাত-১১ লঞ্চের যাত্রী ধারণের ক্ষমতা ১ হাজার ২৫ জন। ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী লঞ্চটিতে লাইফ বয়া থাকার কথা ২৫৩টি, আছে ১১৬টি। ২২টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মধ্যে মাত্র ১২টি থাকলেও তার মধ্যে তিনটি বিকল। এমভি সুরভী-৭ লঞ্চের যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৮৯০ জন। লাইফ বয়া দুইশটির পরির্বতে আছে ১০৫টি। ফায়ার বাকেট ১৮টির মধ্যে তিনটি বিকল। এ লঞ্চের কোথাও বালুভর্তি বাক্সের দেখা মেলেনি।

সুন্দরবন-৭ লঞ্চে যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৯৯০ জন। বয়া আছে ১৫৩টি। একই অবস্থা অন্য লঞ্চগুলোরও। প্রতি যাত্রীর জন্য একটি করে লাইফ জ্যাকেট থাকার বিধান থাকলেও ২/৩টি লঞ্চে সামান্য কিছু থাকলেও অন্যসব লঞ্চে একটি লাইফ জ্যাকেটেরও খোঁজ মেলেনি। প্রতি চার যাত্রীর জন্য একটি করে বয়া থাকার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা নেই। এছাড়া কোন লঞ্চেই প্রয়োজনীয় অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র/ফায়ার বাকেট, পাম্প, ফাষ্ট এইড বক্স, বালির বাক্স নেই।

এমন অবস্থায় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি না থাকলেও লঞ্চগুলো ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ যাত্রী পরিবহন করে থাকে। দক্ষ-মাস্টার সুকানির পরিবর্তে লস্কর দিয়ে মাঝে মধ্যে লঞ্চ চলাচলকরার অভিযোগ রয়েছে। ভরা বর্ষায় মারাত্মক ঝুকি নিয়ে এ সব লঞ্চ চলাচল করলেও কর্তৃপক্ষ ম্যানেজ হয়ে নির্বিকার।

যাত্রীরা অভিযোগ করেন, নাড়ীর টানে বাড়ি ফেরার প্রয়োজনে তারা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে উঠেছেন। তবে লঞ্চ মালিকরা এ সময়ে ২০ ভাগ বেশি ভাড়া রাখলেও কোন ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখে না। কোন ধরনের দূর্ঘটনা, সংঘর্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দূর্য়োগের কবলে পরলে বিপুল প্রানহানি বা হতাহতসহ অপূরনীয় ক্ষতি শংকা রয়েছে বলে মনে করেন যাত্রীরা।