দেড় লাখ টাকা মাসহারায় চলছে আবাসিক হোটেলে দেহ ব্যবসা

নিজস্ব প্রতিবেদক মঙ্গলবার, আগস্ট ৬, ২০১৯ ৯:২৯ অপরাহ্ণ

বরিশাল নগরীতে আবাসিক হোটেলগুলোতে কোনভাবেই থামছেনা দেহ ব্যবসা। পুলিশ ও কতিপয় সাংবাদিকদের মাসোহারা দিয়েই বেশ কিছু হোটেলে এসব অবৈধ কার্যকলাপ চলছে। শুধু দেহ ব্যবসায়ীই নয় এর আড়ালে আবাসিক হোটেলগুলো পরিনত হয়েছে মাদকের স্বর্গরাজ্যে। এসব হোটেলের কারণেই ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে যুব সমাজ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে নগরীর ১০/১২টি হোটেলে চলে গণহারে দেহ ব্যবসা। এসব হোটেলে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন নারী রাখা হয়। আবার কিছু হোটেলে স্থায়ীভাবে মেয়ে না রাখলেও ঘন্টা হিসেবে রুম ভাড়া দেয়া হচ্ছে। এই তালিকায় নগরীর অনেক ভিআইপি হোটেলও রয়েছে। ওই সব হোটেলে যারা যায় তারা বেশিরভাগই স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া। তারা একটি রুম এক ঘন্টার জন্য ৫‘শ থেকে এক হাজার টাকায় ভাড়া নেয়। হোটেল কর্তৃপক্ষ বলছেন তারা পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে এ ধরনের কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সাংবাদিককেও ম্যানেজ করছেন তারা। পুলিশকে মাসোহারা না দিলেই চলে অভিযান।

গণহারে দেহ ব্যবসা চলে যেসব হোটেলেঃ নগরীর ৮/১০টি হোটেলে স্থানীভাবে মেয়েদের রেখে দেহ ব্যবসা চালানো হয়। এই তালিকায় রয়েছে দক্ষিন চকবাজারের গালিব, বরিশাল বোডিং, পোর্টরোড ব্রীজ সংলগ্ন হোটেল সি-ভিউ, পপুলার ইন, অতিথি, অন্তরা, মহসিন মার্কেটে হোটেল ঝিনুক (পূর্বে নাম ছিল মা বোর্ডিং)।, সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবনের পেছনে হোটেল চীল (পূর্বের নাম পাতার হাট), লাইন রোডের হোটেল নুপুর,

গত শুক্রবার দুপুরে পরিচয় গোপন রেখে হোটেল পপুলারে গিয়ে দেখা যায় ১০ জন মেয়ে কক্ষের বাইরে লাইন দিয়ে বসে আছেন খদ্দেরের অপেক্ষায়। রেট জানতে চাওয়া হলে হোটেলের ম্যানেজার জানান, আগে পছন্দ করুন তার পরে রেট দেখা যাবে। হোটেল পপুলার ও সি-ভিই একই ব্যক্তি পরিচালনা করছেন। হোটেলের মূল মালিক মাসিক চুক্তিতে ভাড়া দিয়েছেন। সি-ভিউ ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ী ইসমাইল। প্রতি মাসে হোটেল ভাড়া ৭০ হাজার টাকা।

গালিব, পাতারহাট ও অন্তরাসহ ৬টি হোটেল ভাড়া দিয়ে চালাচ্ছেন মনির নামের এক নারীর দালাল। এই ছয়টি হোটেলের মাসিক ভাড়া গুনতে হয় চার লাখ ২০ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে একটি হোটেলে মাসে কমপক্ষে আয় হয় ছয় লাখ টাকার উপরে। এ হিসেবে হোটেল ব্যবসায়ী মনির মাসে আয় করছেন ৩৬ লাখ টাকার বেশি। এই ব্যবসা করে নারীর দালাল মনির এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। নগরীর রুপাতলীতে করেছেন বাড়ী। বিভিন্ন জায়গায় আছে তার অনেক জমি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি হোটেলে মাসে ছয় লাখ টাকা আয় হলেও এর থেকে দেড় লাখ টাকায় ব্যয় করতে হয় পুলিশ ও সাংবাদিক ম্যানেজ করতে। শুধু কোতয়ালী পুলিশ নয় ডিবি পুলিশকেও টাকার ভাগ দিতে হয়। প্রতি হোটেল থেকে এসআইরা পায় এক হাজার টাকা (সব এসআই নয়), এএসআইদেরকে দিতে হয় ৫‘শ টাকা। থানার ওসিকে প্রতি হোটেল থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়।

ডিবি পুলিশের আটটি টিম রয়েছে। প্রত্যেক টিমকেই আলাদাভাবে টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের পূর্বে ওই সব টিমের সদস্যরা আগেভাগেই হোটেল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দেন। নগরীর বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে প্রতি হোটেল থেকে মাসে ৫‘শ টাকা করে দেয়া হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। শুধু তাই নয় অনেকে আবার সিনিয়র সাংবাদিকদের নাম ভাঙ্গিয়েও টাকা আনছেন। হোটেলে অবৈধ ব্যবসা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে ১০/১৫ দিন হোটেলে নারী ব্যবসা বন্ধ থেকে পুনরায় চালু করা হয়।

সাবেক পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিনের সময় টানা তিন বছর হোটেলে নারী ব্যবসা অনেকাংশে বন্ধ ছিল। ওই সময়ে কোতয়ালী থানার এক ওসি প্রতি তিনটি হোটেল থেকে ৪৫ হাজার টাকা অগ্রীম নিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ কমিশনারের কঠোর নির্দেশনার কারণে টাকা দেয়ার পরেও হোটেলে নারী ব্যবসা চালাতে সাহস পায়নি। পুলিশ কমিশনার বদলি হয়ে যাওয়ার পরে আবার নতুন করে হোটেলগুলোতে জমজমাট হয়ে ওঠে দেহ ব্যবসা। শুধু তাই নয় হোটেলগুলো মাদকের আখড়ায় পরিনত হয়েছে। রাতে যুবকরা হোটেলে গিয়ে নেশায় মত্ত থাকে। মাদক কেনাবেচার নিরাপদ ঘাটি ওইসব আবাসিক হোটেল।

অপর একটি সূত্র জানায়, বেশিরভাগ হোটেলেই কমবেশি নারী ব্যবসা হয় শুধু পদ্ধতিটা ভিন্ন। যেমন হোটেল আলী, ইম্পেরিয়াল, শামস, সিটি প্লাজা, নুপুরে ব্যবসা হয় ঘন্টা হিসেবে। এখানে মেয়েরা থাকেনা। তবে অনেক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা এখানে এসে ঘন্টা হিসেবে রুম ভাড়া নেয়। প্রতি ঘন্টায় হোটেল কর্তৃপক্ষকে ৫‘শ থেকে এক হাজার টাকা দিতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হোটেল ম্যানেজার এ প্রতিবেদককে বলেন, নারী ব্যবসা না করলে হোটেলে প্রতি মাসে লাভতো দূরের কথা ভাড়া টাকাও ওঠেনা। ফলে আমরা বাধ্য হয়েই নারী ব্যবসা করছি। এতে করে আমাদের যেমন লাভ হচ্ছে তেমনি কিছু পুলিশ ও কিছু সাংবাদিকও লাভবান হচ্ছে। আমরাতো সব একারা খাচ্ছিনা। সবাইকে ম্যানেজ করেই চলতে হচ্ছে।

চোখ রাখুন চলবে……….