বরিশালে সন্ত্রাসের অন্যতম হোতা ‘আব্বা গ্রুপ’

নিজস্ব প্রতিবেদক শুক্রবার, আগস্ট ২, ২০১৯ ৬:০০ অপরাহ্ণ

বরিশালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর সন্ত্রাসীদের একটি ভয়ংকর গ্রুপ। এই গ্রুপটির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকা সত্বেও এদের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মামলা বা অভিযোগ হলেই গ্রেফতার আর জেল থেকে বের হয়েই পুনরায় অপকর্মে লিপ্ত হয় এই সন্ত্রাসী গ্রুপটি। এমনটাই জানা গেছে বেশ কয়েকটি সূত্রের মাধ্যমে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘আব্বা গ্রুপ’ নামে পরিচিত এই কিশোর সন্ত্রাসী গ্রুপটি মূলত নগরীর প্রানকেন্দ্র সদর রোডে অবস্থান করে থাকে। তবে বাংলাদেশের ব্যাংক রোডের মূখে, পরেশ সাগরের মাঠ, জিলা স্কুলের মোড় এবং সিটি কলেজের মধ্যেই এদের আড্ডা এবং অপকর্মের স্থল। এই গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা ৪৫ ছাড়িয়েছে। যারা সকলেই সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে জড়িত। জানা গেছে, ‘আব্বা গ্রুপ’ এর নেতৃত্বে রয়েছে সৌরভ বালা ও তানজিম নামের দুই বখাটে যুবক।

এরা এখন বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের এক নেতার ছত্রছায়ায় রয়েছে। মূলত এরা কোনো দলেরই সমর্থক নয়। এক সময় জেলা ছাত্রদলের এক যুগ্ম আহ্বায়কের অনুসারী ছিলো। পরে এরা ছাত্রলীগের অনেক নেতার সাথে থাকার চেষ্টা করলেও তারা এতটাই বেপরোয়া ছিলো যে কেউ তাদের গ্রহণ করেনি। সর্বশেষ বছর দুই যাবৎ তারা জেলা ছাত্রলীগের এক প্রভাবশালী নেতার পেটেয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করছে। আর তাদের গ্রেফতার করা হলে ছাড়িয়ে নিতে ছাত্রলীগ নেতাদের ‘তদবির’ যন্ত্রণায় থাকতে হয় থানার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের। এমনটাই জানিয়েছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার এক কর্মকর্তা। এই গ্রুপের রয়েছে অনেক পরিমানে ধারালো অস্ত্র। যা মজুদের জন্য নির্ধারিত জায়গাও রয়েছে তাদের।

অপরদিকে বরিশাল সিটি কলেজ থেকে এই গ্রুপটির বিরুদ্ধে পাওয়া গেঠে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিত দেবনাথের উপর হামলার পর বিষয়টি খোলাসা হয়েছে। সিটি কলেজে বসে নানা অপকর্মের প্রেক্ষিতে অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার পুলিশ আব্বা গ্রুপের প্রধান সৌরভ বালাকে গ্রেফতার করে। তবে বুধবার জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সৌরভ বালা তার ২০ জন সহযোগি নিয়ে ধারালো ছোড়া ও লাঠিসোটা নিয়ে সিটি কলেজের মধ্যে বসেই অধ্যক্ষ সুজিত কুমার দেবনাথের উপর হামলা চালানো হয়। এসময় অধ্যক্ষকে কুপিয়ে জখম করা হলে তাৎক্ষনিক তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে হামলার ঘটনার সাথে সাথেই ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মিজানুর রহমান রুবেল নামে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

তাছাড়া এই ঘটনায় সিটি কলেজের নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর আউয়াল হোসেন বাদি হয়ে বুধবার রাতে কোতয়ালী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। হামলাকারী বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) নুরুল ইসলাম। আটককৃত মিজানুর রহমান রুবেল ছাড়াও অন্যান্য আসামিরা হলো- কিশোর গ্যাং এর প্রধান সৌরভ বালা ও ইয়ামিন হোসেন জুয়েল সহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন। এদের মধ্যে কিশোর গ্যাং প্রধান সৌরভ বালা ও ইয়ামিন সহ তিনজনকে সিটি কলেজ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বুধবার সকালেই তারা জেল থেকে বের হয়ে হামলার ঘটনা ঘটায়।

সিটি কলেজের ক্যাশিয়ার এসএম সাইদুর রহমান জানান, ২০১৫ সালে সিটি কলেজের অফিস কক্ষের আলমিড়া ভেঙে টাকা লুট করা হয়। যে ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় সৌরভ বালা ও রুবেল সহ বেশ কয়েকজন আসামী ছিলো। গত ২৯ জুলাই ওই মামলায় সাক্ষী দিয়ে আসার পর পরই সৌরভ বালা, রুবেল সহ একদল যুবক ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে হট্টোগোলের সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সৌরভ বালা ও ইয়ামিন হোসেন জুয়েল সহ তিন যুবককে আটক করে নেয়। এই ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে মামলা না দেয়ায় পুলিশ তাদেরকে মেট্রো অধ্যাদেশে আদালতে চালান দেয়। এর পর বুধবার (৩১ জুলাই) আদালত থেকে ছাড়া পেয়েই পুনরায় দলবল সহ লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে সৌরভ, রুবেল, ইয়ামিন সহ তাদের সহযোগিরা। পরে তাদের হামলায় কলেজ অধ্যক্ষ আহত হলে তাকে উদ্ধার করে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জানা গেছে, আব্বা গ্রুপ নামে পরিচিত গ্রুপটি সিটি কলেজের একটি রুম দখল করে সেখানে টর্চার সেল নির্মান করেছিলো। মাদক সেবন থেকে শুরু করে ছিনতাই, ইভটিজিং এবং চাঁদাবাজী করতো এই গ্রুপটি। আর তাদের কথা কেউ না শুনলে সিটি কলেজের ওই কক্ষের মধ্যে আটকে নির্যাতন চালানো হতো। ২০১৫ সালে এই গ্রুপটি সিটি কলেজের ক্যাশ ভেঙে টাকা ছিনতাই করে। এই গ্রুপের প্রধান সৌরভ বালা ও তানজিম সহ অনেকে ছাত্রীদের নানা ভাবে বিরক্ত করতো। সিগারেট পান করে এ ধুয়ো মেয়েদের মুখে ফেলা হতো।

এছাড়া জোড় করে ছাত্রীদের সিগারেট খাওয়ানোর ঘটনাও রয়েছে বেশ কয়েকটি। জেলে যাওয়ার পূর্বে সৌরভ বালা ও তার সহযোগিরা এক মেয়েকে নিয়ে এসে কলেজের একটি কক্ষে প্রবেশ করার ব্যাপক চেষ্টা করে। রুমে তালা দেয়া থাকায় তারা অসামাজিক কার্যকলাপ সেখানে বসে করতে পারেনি। এদের কারণে সাধারণ মানুষ জিম্মি বলে জানিয়েছেন বরিশাল সিটি কলেজের ক্যাশিয়ার সাইদুর রহমান। অধ্যক্ষ’র উপর হামলা নিয়ে আব্বা গ্রুপের বিরুদ্ধে মোট তিনটি মামলার খবর জানা গেলেও এদের বিরুদ্ধে ৭ থেকে ৮টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাইদুর রহমান।

লিয়াকত হোসেন নামে সদর রোড এলাকার এক ব্যক্তি জানান, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে এই গ্রুপের চাপে রয়েছে তারাও। নানা অপকর্মের সাথে জড়িত থাকলেও এদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো একশন নেয় না তারা। সম্ভবত পুলিশ কোনো হত্যাকান্ডের অপেক্ষা করছে। আর তারপরেই আট ঘাট বেধে আব্বা গ্রুপ নিশ্চিহ্ন করতে নামবে। তবে এর আগে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একশন নিয়ে এরকম দুর্ধর্ষ কিশোর সন্ত্রাসী গ্রুপের গোড়া সহ উপরে ফেলতে পারে তাহলে নগরবাসী নিশ্চিন্ত হবে।

এই গ্রুপটি অনেক আগে থেকেই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসলেও তারা প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল। এইদিন সন্ধ্যায় এই গ্রুপের ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য ধারালো অস্ত্র নিয়ে জিলা স্কুলের মোড় থেকে ব্রাউন কম্পাউন্ড পর্যন্ত যত যানবাহন ছিলো সব ভাঙচুর করেন এবং পরে এক ব্যক্তিকে মারধর ও কুপিয়ে জখম করে। পাশাপাশি ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকার বেশ কয়েকটি বসত ঘরেও হামলা চালায় এই গ্যাং গ্রুপটি। ঘটনার সময়েই স্থানীয়দের সহায়তায় সৌরভ বালাকে ধারালো অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশ। পরে স্কুল ছাত্র সাগর হাওলাদার, রিফাতুল ইসলাম, তানভির আহসান জিয়াদ, শোভন বিশ্বাস, তৌসিক হাওলাদার, নাজিম উদ্দিন রাতুল, আব্দুল্লাহ আল তামিম এবং আরমান শরীফকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা সবাই নগরীর বিএম স্কুল, মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একে ইনস্টিটিউট এর বিভিন্ন শ্রেণির ছাত্র ছিলো।

এই ঘটনায় বেশ কয়েকদিন সৌরভ বালা সহ তার সহযোগিরা কারাভ্যন্তরে থাকলেও বের হয়ে তারা পুনরায় তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যহত রাখে। এরপরেই একই বছরের ২৪ অক্টোবর চাঁদা দাবী করে তা না পাওয়ায় তারা নগরীর গীর্জা মহল্লা এলাকার একটি মোবাইলের দোকানে ভাঙচুর চালায়। সৌরভ বালা ও তানজিমের নেতৃত্বে ২৫/৩০ জনের গ্রুপ এই দোকানটিতে হামলা চালিয়ে দোকান মালিক সোহেল ও জুয়েলকে বেধরক মারধর করে। এই ঘটনায় সাতজনকে আসামী করে থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছিলো বলে জানিয়েছিলেন কোতয়ালী মডেল থানার সাবেক সেকেন্ড অফিসার সত্যরঞ্জন খাসকেল। এখানেই থেমে নেই, এদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যহত রয়েছে পুরো বরিশাল নগরী জুড়ে।

নগরীর বালিকা বিদ্যালয়গুলোর সামনে এই গ্রুপের সদস্যদের অবস্থান থাকে। ছাত্রীদের মারাত্মক ভাবে ইভটিজিং করে থাকে এরা। পাশাপাশি বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের সামনে সৌরভ বালার বাসা হওয়ায় মহিলা কলেজের সামনে কার্যক্রম চালাতে তার বেশী বেগ পেতে হয় না। আর মেয়ে উত্তক্ত্য করাকে কেন্দ্র করে সাধারণ যুবকদের উপর হামলার ঘটনা নিত্যদিনের সংবাদ। এরা ভাড়াটে সন্ত্রাসী বলেও অভিমত অনেকের এবং এই সন্ত্রাসী গ্রুপটির লিডে রয়েছে তানজিম ও সৌরভ বালা। এছাড়াও সক্রিয় সদস্য রয়েছে- রাব্বি ও রবিন নামের দুই কিশোর। কয়েকবছর পূর্বে তানজিমকে ঢাকা-বরিশাল লঞ্চ থেকে এক নারীকে শ্লীতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। কিছুদিন কারাবাসের পর সে পুনরায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যহত রাখে।

নগরীতে আব্বা গ্রুপ ত্রাস করলেও বিএম কলেজের মধ্যে আজমল হোসেন রুমন নামে একটি গ্রুপ রয়েছে। এই গ্রুপের প্রধান রুমনের বিরুদ্ধে কাউনিয়া থানায় একটি হত্যা মামলাও রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজী থেকে শুরু করে কলেজ ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। ইতিপূর্বে কলেজের মধ্যে ভ্রাম্যমান দোকান ভাঙচুর করেছে এই গ্রুপটি। কলেজের ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক হলের ১০১নং কক্ষে আজমল হোসেন রুমন বসবাস করে।

তার রুমেই ধারালো অস্ত্র মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বস্ত সূত্র। তাছাড়া এই হলের বিভিন্ন কক্ষে সন্ধ্যার পর মাদক সেবনের বিশাল আড্ডা বসে। এক কলেজ ছাত্রের অভিমত, প্রতিদিন গড়ে এই হলেই ১৫ হাজার টাকার ইয়াবার চালান আসে। আর যেটা পুরোটাই নিয়ন্ত্রন করে থাকে আজমল হোসেন রুমন। এমন অভিযোগ করেছেন এই হলের বেশ কয়েকজন ছাত্র। রুমন গ্রুপের সদস্য সংখ্যাও ৬০ জনের বেশী হবে। তাছাড়া সেও বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের এক নেতার ছত্রছায়ায় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। যে কারণে কলেজ প্রশাসনও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না।

এর পাশাপাশি নগরীর বটতলা, আলেকান্দা, বগুরা রোড, মেডিকেল কলেজের সামনে, ভাটারখাল ও কেডিসি, কাউনিয়া এবং পলাশপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধেও কয়েকটি মামলা রয়েছে। তবে এসব গ্রুপের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি সূত্রের মাধ্যমে।

এই বিষয়ে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশালের সাধারণ সম্পাদক কাজী এনায়েত হোসেন বলেন, কিশোর অপরাধটি তৈরী হয় পারিবারিক বন্ধন নড়বরে হয়ে যাওয়া, সন্তানের প্রতি বিধি নিষেধ কমে যাওয়ার কারণে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে এরা ওই দলের শক্তি বা পাওয়ার অর্জন করে গ্রুপ তৈরী করে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সাহাবুদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, কিশোররা যখন অপরাধ করে তখন তাদের অপরাধীর চোখেই দেখি। সে যে ধরণের অপরাধ করবে সেই রকম আইনে তার বিচার হবে।