ভারতের নাগরিকত্ব বিল, বঞ্চিত করার আইন তৈরি

নিজস্ব প্রতিবেদক বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯ ৮:১০ অপরাহ্ণ

নাগরিকত্ব পাওয়ার সমান ও মৌলিক অধিকার থেকে লাখ লাখ মুসলিমকে বঞ্চিত করার ‘আইনগত ক্ষেত্র’ তৈরি করছে ভারত সরকার। অথচ ভারতের উচিত ছিল, আইন পাস করে কে কোন ধর্মের সে তোয়াক্কা না করে শরণার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবায়ন। ‘রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সব নাগরিক আইনের চোখে সমান’; ভারতের সংবিধানের ১৪নং ধারায় একথা বলা রয়েছে। এছাড়া ভারতীয়রা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দর্শন, আদর্শ, অনুপ্রেরণা মেনে ও জেনে থাকে, নাগরিকত্ব বিলে রবীন্দ্রনাথের কবিতার মর্মও ক্ষুণ্য হয়েছে ‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।/ এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খ্রিস্টান।/ এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার।’ যে ভারতের মূল আদর্শ মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংস নীতি’; এ আইন পাসে সে নীতিতেও কালিমা লেপন হয়েছে। আমারা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি, ধর্মের ভিত্তিতে ভারতের বিভাজন ও বৈষম্য! ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন বিলে যে ধর্ম পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে আমরা মনে করি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ‘ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রস্তাবিত আইনটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন। নাগরিকত্ব বিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য।’ আমরা দেখছি, ভারতের লোকসভায় সংখ্যাতাত্ত্বিক যে হিসাবটা হাজির করা হয়েছে, সেটিও ঠিক নয়। বরাবরই ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা চরমভাবে বিরাজ করে থাকে। বাংলাদেশে নয়।

প্রত্যেক দেশই অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চায়। সেটা ভারত করলে, অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে সেখানে আমাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু আমরা দেখছি, এখানে ধর্মটাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিলের মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতেই ভারতের সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যদিও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়নি; কিন্তু তার এ দাবি মিথ্যা, সঠিক নয়।

ইতোমধ্যে খোদ ভারতেই এ বিল নিয়ে প্রতিবাদের ঝর বইছে। বিলটি লোকসভায় পাস হওয়ার আগে ৭ ঘণ্টা বিতর্ক হয়েছে। কলকাতাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম, মণিপুর ও ত্রিপুরায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। বিভিন্ন রাজ্যে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ধর্মঘট পালিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কংগ্রেস নেতা শশী থারুর, অধীর চৌধুরী, গৌরব গগৈ ছাড়াও সংখ্যালঘু নেতৃত্বের মধ্যে অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের নেতা বদরুদ্দিন আজমল, আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যসহ বড়বড় নেতা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তারা বলেছেন, এ বিল একেবারেই অসাংবিধানিক।

আমরা আশা করি, ভারতের বোধোদয় হবে। ধর্মের বিষয়টি এলেই কিন্তু জাতিভেদ, বিভাজন ও বৈষম্য শুরু হবে। ইতোমধ্যে আমরা নানা বিভেদও সেখানে লক্ষ্য করেছি। রাজ্যসভায় ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধীদলগুলোর মধ্যে তুমুল বিতর্কের পর ভোটাভুটিতে ১২৫টি ভোট পড়েছে বিলের পক্ষে, বিপক্ষে পড়েছে ১০৫টি। এবার রাষ্ট্রপতি সই করলেই বিলটি আইনে পরিণত হবে। ভারতের যেসব নেতা বিষয়টি বুঝতে পেরে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, তাদেরকে ধন্যবাদ।