মুলাদীর ইউপি চেয়ারম্যান জাপানের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ কোথায় ?

নিজস্ব প্রতিবেদক সোমবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৯

বরিশালঃ মুলাদী উপজেলার ২নং নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাসনাত জাপানের বিরুদ্ধে এলজিএসপি-৩, টিআর ও কাবিখার বরাদ্দের টাকা এবং বিভিন্ন ভাতা গ্রহণকারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা থেকে শুরু করে গ্রাম পুলিশের বরাদ্দের টাকাও লুটপাট করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাজিরপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবু হাসনাত জাপান বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতসহ এলাকায় নানা অপকর্মের মূলহোতা এই চেয়ারম্যান বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।

চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা ও লুটপাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে নাজিরপুর উন্নয়ন কার্যক্রম। নাজিরপুর ইউনিয়নবাসীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের এলজিএসপি বাস্তবায়নে কোন প্রকার দরপত্র আহ্বান না করেই কাগজে-কলমে ঠিক রেখে আরএফকিউ অনুসরণ করে ঠিকাদার নিয়োগ দেখানো হয়। গত ২০১৬ থেকে ২০১৯ প্রায় ৩ বছরে এলজিএসপি-৩ এর বরাদ্দকৃত অর্থে মানব কল্যাণ ও পিছিয়ে পড়া নারীদের ক্ষমতায়নে নামেমাত্র প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের সকল টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাসনাত জাপান।

প্রকল্পের আওতায় ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ঐ প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়নের চর নাজিরপুর বিদ্যালয় সংলগ্ন অভিভাবকদের উন্মুক্ত বৈঠকখানা নির্মাণের জন্য ১,৮৫,২৪৬ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। আজ পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়নি অভিভাবকদের জন্য বসার বৈঠকখানা। নির্মাণ না করেও বরাদ্দের অর্থ তুলে নেন ইউপি চেয়ারম্যান ও তার নিজস্ব সেই নামসর্বস্ব ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। উল্টো চেয়ারম্যান জাপান বৈঠকখানার জন্য নির্ধারিত স্থানে নির্মাণ করছেন নিজের আলীসান বাড়ি।

একই অর্থ বছরের এলজিএসপি-৩ আওতায় নাজিরপুর ইউনিয়নের অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের সরঞ্জম ক্রয়ের জন্য ৪,৯৮,০০০ করা হয় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে। বরাদ্দের সেই টাকা উত্তোলন করে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা কিনে প্রতিদিন ২০০ টাকার বিনিময়ে ভাড়া দিচ্ছেন চেয়ারম্যান জাপান। অতি দরিদ্র’র জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচীর শ্রমিকদের তালিকা অনুযায়ী যদি কোন শ্রমিক কাজে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে তার মজুরির টাকা ব্যাংকে জমা থাকবে। কিন্তু তার ইউনিয়নে চলে উল্টো নিয়ম অনুপস্থিত শ্রমিকের টাকা কাগজে কলমে উপস্থিতি দেখিয়ে কৌশলে ব্যাংক থেকে তুলে নেন চেয়ারম্যান জাপান ও তার প্রতিনিধিরা।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে পিজিবি বরাদ্দে উত্তর সাহেবেরচর আবদুল্লাহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ব্রিজ থেকে খেয়াঘাট পর্যন্ত ইটের সোলিং রাস্তা নির্মাণের জন্য সরকারিভাবে ৪,৯৯,৮১২ টাকা বরাদ্দ হলেও রাস্তায় নিম্ন মানের ইট ও বালি ব্যবহার করার অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। একই অর্থ বছরে কোন ওয়ার্ড সভা, ওয়ার্ড কমিটি বা স্কিম সুপার ভিশন কমিটি গঠন পর্যন্ত করেনি ইউপি চেয়ারম্যান। বিগত বছরগুলোতে নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদে কোন উম্মুক্ত বাজেট ঘোষণা করা কিংবা সদস্যদের নিয়ে বাজেটের জন্য কোন সভা পর্যন্ত করে না চেয়ারম্যান জাপান।

বাস্তবে কোন কার্যক্রম না করলেও কাগজে কলমে সব কার্যক্রম পরিপূর্ণভাবে করে থাকেন চতুর এই ইউপি চেয়ারম্যান। ইউডিসিসি স্থায়ী কমিটির সভা ও পরিকল্পনা সভাও করা হয়না বলে অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। পরিষদের অধিকাংশ কার্যক্রম ৪/৫ জন ইউপি সদস্য ছাড়া অন্যান্যদের অবহিত কিংবা মতামত নেয়া হয়না বলে অভিযোগ করেন একাধিক ইউপি সদস্যের।

ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে অভিযোগ করেন, পরিষদের রাজস্ব আয়ের টাকাও চেয়ারম্যান নিজের ইচ্ছেমত ভূয়া ভাউচারে আত্মসাৎ করেন। এমনকি ব্যাংকের লেনদেন করেন চেয়ারম্যান নিজের খেয়াল খুশিমত। যা ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাবগুলোর বিষয় তদন্ত করলে সব বেড়িয়ে আসবে। তিনি আরো বলেন, ইউনিয়নের বিভিন্ন ভাতাভোগীদের কাছ থেকে তালিকাভূক্তির আগেই ৩/৪ হাজার টাকা জনপ্রতি উৎকোচ গ্রহণ করেন চেয়ারম্যান জাপানের প্রতিনিধিরা।

নাজিরপুর ইউনিয়নের সকল খেয়াঘাটের ইজারা কাগজে কলমে মওকুফ দেখানো হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে ঘাট ভাড়া বাবদ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা। এতে করে সরকার প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাক রাজস্ব হারাচ্ছে। গ্রাম পুলিশের এক সদস্য অভিযোগ করেন, আমাদের জন্য গ্রাম আদালতের নোটিশজারীর পারিশ্রমিকসহ সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থ পর্যন্ত আত্মসাত করেন এই চেয়ারম্যান। এসব অনিয়মের বিষয় যদি কোন সদস্য চেয়াম্যানের নিকট জানতে চায়, তাহলে তাদেরকে এলজিএসপি’র অডিট টিম ও ডিষ্ট্রিক ফেসিলিটেটর (ডিএফ) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উৎকোচ দিতে হয় বলে জানান।

এবিষয় নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বলেন, অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করতে বলে। এমনকি তিনি কোন ধরণের তথ্য দিতে পারবে না বলে ফোন কেটে দেন।

ইউপি চেয়ারম্যান আবু হাসনাত জাপান সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার সকল কাজে স্বচ্ছতা আছে প্রয়োজনে আপনারা কাগজপত্র চেক করতে পারেন। বিভিন্ন ভাতা প্রদানে টাকা নেওয়ার বিষয় বলেন, আমি ভাতা গ্রহিতার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোন টাকা নেই না, তবে যাদের সুপারিশে ভাতার কার্ড দেওয়া হয় তারা যদি টাকা নিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে আমার কিছু করার থাকে না। কারণ এই সকল সুপারিশগুলো ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা করে থাকেন।

অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য ব্যাটারি চালিত গাড়িটি কেন ভাড়ায় চালানো হচ্ছে? এমন প্রশ্নের চেয়ারম্যান বলেন, গাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়নি তবে সেটি ঠিক রাখার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের লোকজন নিয়মিত ব্যবহার করেন। কারণ এই গাড়িটি বসিয়ে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে বলে ইউপি চেয়াম্যান দাবী করেন।