বিশ্বাসঘাতকতায় দুই শতাব্দীতে বাঙালির দুটি মহাবিপর্যয়

সোহেল সানি শনিবার, আগস্ট ২৪, ২০১৯

গত দুই শতাব্দীর দুটি হত্যাকান্ড, দুটি পরাজয়, দুটি বিপর্যয়, দুটি ভুল এবং দুটি বিশ্বাসঘাতকতাই বাঙালিদের জীবনে দুটি মহাবিপর্যয় ডেকে আনে। প্রথমটি পলাশী বিপর্যয়ের দশ বছরের মাথায় ইংরেজ সৃষ্ট এবং দ্বিতীয়টি পলাশী বিপর্যয়ের ২১৪ বছরের মাথায় পাকিস্তানীদের সৃষ্ট। পাকিস্তানীরা ১৯৭১ সালে শুধু পূর্ববাংলায় গণহত্যা চালিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মধ্যে হত্যা করে ত্রিশ লাখ। কিন্তু ইংরেজরা সমগ্র বাংলায় মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশকেই প্রাণে মারে না খাইয়ে, দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে ১৭৬৯-৬০ সালের সেই মহা বিপর্যয়ে পৌনে দুই কোটি বাঙালিকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

যেমন, দুটি হত্যাকাণ্ড মানে সিরাজউদ্দৌলা শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড। দুটি পরাজয় হচ্ছে পলাশী যুদ্ধ ও অখন্ড বাংলার মৃত্যু। দুটি ভুল- বলতে মুসলিম লীগের কর্ণধার অবাঙালী কায়েদে আযম জিন্নাহর অধীনস্থ হয়ে পড়া। জিন্নাহর নির্দেশ মেনে শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাব ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন।

১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌলার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে সেনাপতি মীর জাফর আলী খান এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে সেনা উপপ্রধান জিয়াউর রহমান। বিশ্বাসঘাতক ও বিশ্বাসঘাতকের মধ্যেও লড়াই হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মাথায় খুনীচক্রের পরামর্শে রাজনৈতিক গুপ্তচর রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক জিয়াকে সেনাপ্রধান করেন। কিন্ত সেই মোশতাককে সামরিক আদালতে সাজা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করেন জিয়া। জিয়া খুনীচক্রকেও আঘাত করেন। ফারুক -রশীদ দেশে ফিরে জিয়াকে উচ্ছেদের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ধরা খেয়ে দেশান্তরী হন।

সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই পদচ্যুত ও গৃহবন্দী হলে কর্ণেল আবু তাহের সিপাহী বিদ্রোহ করে জিয়াকে স্বপদে আসীন করেন , সেই তাহেরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। তাহেরকে পুরস্কৃত করা হয় ফাসি দিয়ে। জাসদ ও গণবাহিনী নেতাদের যাবজ্জীবনসহ দেন বিভিন্ন মেয়াদে দন্ড। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থাতেই জিয়া ব্যর্থ এক সামরিক অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে নিহত হন। জিয়া বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করে বঙ্গভবনে নিজের মাথার ওপরে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীর ছবি টাঙ্গিয়ে স্বার্থ সিদ্ধি করেন।

শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক দলবিধি আইন করে আওয়ামী লীগকে ঘোষণাপত্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলতে বাধ্য করেন। বলা বাহুল্য ইতিহাস নিষ্ঠুর নির্মম। সে কাউকে ক্ষমা করে না। তাই বাস্তবতা হচ্ছে ১৯ বার হত্যার হাত থেকে বেচে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যার হাতেই আজ বাংলাদেশ। সবার মাথার ওপর প্রদর্শিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। এখন চন্দ্রিমা উদ্যানস্থ জিয়ার লাশ সরিয়ে জাতীয় সংসদের সৌন্দর্য বর্ধণের সরকারি ঘোষণায় উদ্বিগ্ন তার পত্নী বেগম খালেদা জিয়া এবং তার সৃষ্ট দল বিএনপি। নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্বগৌরবে ফিরে আসতে লেগেছিল ১৩৬ বছর। আর বঙ্গবন্ধুকে ফিরে আসতে লেগেছে ২১ বছর। এমন একদিন আসবে যেদিন বাঙালিরা সবাই মিলে কাদবে – বঙ্গবন্ধু তুমি ক্ষমা করো বিপদে মোরা বুঝিনি বলে।

উল্লেখ্য, শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দী দুই নেতাই অখন্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রস্তাব দুটি উত্থাপিত হয়েছিল বলেই মুসলিম লীগ ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পেরেছিল। বিভাগের প্রস্তাবকে বিবাদ বিগ্রহ। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ভারতের একমাত্র প্রদেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাঙলাতেই মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতালাভ করেছিল সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে। যে কারণে শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাবকে সংশোধন করে তা পাকিস্তান প্রস্তাব হিসাবে উত্থাপন করানো হয় সোহরাওয়ার্দীকে দিয়ে। একাধিক রাষ্ট্র গঠনের স্থলে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র গঠনের সেই প্রস্তাব দিল্লি কনভেনশনে পাস হয়ে যায়।

পশ্চিম বাংলা সরকার দেনার দায়ে কলকাতার বাড়িঘর নিলাম হলে সোহরাওয়ার্দী করাচীতে আসেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকা গণপরিষদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করে। পূর্বপাকিস্তানে নিষিদ্ধ ঘোষিত হন। তাকে ‘ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর’ ও রাষ্ট্রদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। গণরায়ে আওয়ামীলীগ প্রধান সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেও তার জের ধরে জেল জুলুম নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়ে বৈরুতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

শেরেবাংলার ভাগ্যেও জোটে করুণ পরিণতি। লাহোর প্রস্তাবের কদিনের মাথায় মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন এমনকি বাংলার প্রধানমন্ত্রীত্বও। বাংলা বিভাগের সময় তাঁকে কোন ভুমিকায় ছিলেন না। কলকাতা পূর্ব বাংলার ভাগে ফেলতে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কলকাতায় আন্দোলনে নামলেও অবাঙালী ঢাকার খাজা নাজিমুদ্দীনের কারণে তা ভেস্তে যায়। পঁচিশ কোটি টাকার বিনিময়ে কলকাতা হাতছাড়া করা হয় । বাহান্নের ভাষা আন্দোলনে পক্ষ করতে গিয়ে পুলিশের পিটুনির শিকার হন। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসাবে পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে পশ্চিম বাংলায় সফরে যান।

রাজধানী কলকাতা সংবর্ধিত হয়ে বলেন, বাঙালি ও বাংলা এক এবং অভিন্ন, একে ভাঙ্গা যায় না। রাজনীতিকরা দুই বাংলা মধ্যে এক মিথ্যার প্রাচীর দাড় করিয়েছেন সুযোগ পেলে আমি তা ভাঙ্গবো। এই বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রীর পদ হারান শেরেবাংলা। দেশদ্রোহী বলা হয় তাকে। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দুই বছর আগেই শেরেবাংলা মৃত্যুবরণ করেন। প্রথমটির সঙ্গে দ্বিতীয়টির দূরত্ব দুই শত চৌদ্দ বছরের। দূরত্ব যাহোক এর প্রতিক্রিয়া ছিল সুদূরপ্রসারী, অভিনব ও অভিন্ন। দুটি ঘটনাই ছিল কতিপয় স্বার্থান্ধ বাঙালির বিশ্বাসঘাতকতার ফল।

প্রথম ঘটনাটির ফলভোগী হয় ব্রিটিশরা। দ্বিতীযটির ফলভোগী হয় পাকিস্তানীরা। ইতিহাসের কি অভিনব যোগসূত্র! ব্রিটিশদের খেদিয়ে বাঙালিরা কিনা জাতিসত্ত্বা বিলীন করে রাতারাতি পাকিস্তানী হতে চাইলো। প্রতিদানে বাঙালিরা ক্ষমতা অধিকার করতে গিয়ে হলো বিচ্ছিন্নতাবাদী। গণহত্যার মারা পড়লো লাখে লাখে বাঙালি, ধর্ষিতা হাজারে হাজার। গুণতিতে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ালো লাখ-ত্রিশে। বাঙালিদের হাতেই বাঙালিদের বিপর্যয় নেমে আসে। তিনটি বৃহত্তম বিপর্যয়ের নেপথ্যে বাঙালিদের দুশমনি প্রধানত দায়ী।

বাঙালিদের বিপর্যয়ের প্রথম সূত্রপাত ১৭৫৭ সালে, গুটিকয়েক বাঙালি সৈন্যের হাতে এবং শেষ বিপর্যয়ের সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে গুটিকয়েক বাঙালি সৈন্যের হাতে। ইতিহাসের এই দুটি নিষ্ঠুর ও নির্মম বিপজ্জনক অধ্যায়ের স্থপতি সেনাপতিরাই। আর পরিণতির শিকার পুরো সৈন্য বাহিনী এবং গোটা বাঙালি। ইংরেজ সৈন্যদল যখন নবাব সিরাজদ্দৌলার মস্তকবিহীন দেহ হস্তির পিঠে বেধে রাজধানীতে প্রবেশ করে তখন বাঙালি সৈন্যদের ন্যয় উৎসুক বাঙালিরাও করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়।

নির্বাক, নির্জীব পলাশীযুদ্ধে একটি ইংরেজ কোম্পানির বিজয়ের দিবা স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলে বাঙালিরাই। অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতক প্রধান সেনাপতির খপ্পরে পড়ে সৈন্যবাহিনীর জেগে ঘুমিয়ে থাকার ফলে অস্তমিত হয়ে যায় বাংলার স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতা এনে দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । অথচ তাকে হত্যার পর আমরা তাকে ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। মূর্খতা, ধর্মীয় কুসংস্কার ও জাতীয়তাবোধের অভাবে পশ্চাতমুখী বাঙালিরা এখন কতটা এগিয়েছি সেটাই মাথায় রাখছি।

লেখক
সোহেল সানি, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট