ছয় জেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদের ৬৪ ভাগই শূণ্য

অতিথি প্রতিবেদক সোমবার, আগস্ট ১৯, ২০১৯

চিকিৎসক সংকটে দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলায় ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত সহ সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা ক্রমাগত সংকটে পড়ছে। প্রয়োজনের অনেক কম মঞ্জুরীকৃত পদেরও ৬৪ ভাগ চিকিৎসকের পদ শূণ্য থাকায় এ অঞ্চলে সরকারী চিকিৎসা সেবা মুখ থুবড়ে পড়ছে। প্রতিনিয়ত চিকিৎসা প্রত্যাশীরা দূর্ভোগে পড়ছেন জেলা সদর থেকে উপজেলা পর্যন্ত। এমনকি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিয়েও মারাত্মক সংকট চলছে। ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারে পৌছেছে। মৃতের সংখ্যা ছয়। সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা আড়াই হাজার অতিক্রম করেছে।

চিকিৎসক সংকটে সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে উপজেলা চিকিৎসা সেবা প্রশাসন যেখানে সাধারন রোগীদের সামাল দিতে পারছিলেন না, সেখানে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ও তার রোগীদের নিয়ে ইতোমধ্যে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধীক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলা ও ৪২টি উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদ মাত্র ১ হাজার ১৩১টি হলেও কর্মরত আছেন ৪১১জন। মঞ্জুরীকৃত পদের মাত্র ৩৬ ভাগ চিকিৎসক নিয়ে সরকারী চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। যার কারনে জনমনে হতাশার সাথে এখন ক্ষোভও বাড়ছে।

দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলেও তা থেকে উত্তরনে সরকারী কোন উদ্যোগ নেই। প্রতিটি বিসিএস-এর পরে বেশ কিছু চিকিৎসককে বরিশাল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশীরভাগই নানা ফন্দি ফিকির করে ঢাকা ও এর আসে পাশের এলাকায় বদলী হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সদ্য নিয়োগ দেয়া অনেক চিকিৎসককে প্রেসনে বা ওএসডি করেও ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তদবিরের প্রভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের একটি বড় অংশই ঢাকা ও এর আসেপাশের এলাকায় চলে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল মহলের।

অপরদিকে পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠী জেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে শয্যা বৃদ্ধির ঘোষনা দেয়া হলেও চিকিৎসক সহ প্রয়োজনীয় জনবল মঞ্জুরী হচ্ছেনা দীর্ঘদিনেও। এমনকি এ অঞ্চলের ৬টি জেলার ৪২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যা হাসপাতালে উন্নীত করা হলেও তার বিপরীতে কোন জনবল মঞ্জুরী হয়নি। পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠী জেলা সদরের হাসপাতালগুলো ১শ শয্যা থেকে আড়াইশ শয্যায় উন্নীত করনের লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মান করে সে লক্ষ্যে সরকারী ঘোষনা দেয়া হলেও চিকিৎসক সহ জনবল মঞ্জুরী হচ্ছেনা। ফলে এসব হাসপাতাল চলছে (?) ৫০ শয্যার হাসপাতালের মঞ্জুরীকৃত জনবলের অর্ধেক চিকিৎসক দিয়ে। জেলা সদরের হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পরেও পুরনো জনবল মঞ্জুরীরও প্রায় ৬৫% শূণ্য।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বরগুনা জেলায়। সাগর পাড়ের এ জেলা সদর সহ ৫টি উপজেলায় মঞ্জুরীকৃত ১৬৫টি চিকিৎসক পদে কর্মরত আছেন মাত্র ৪১জন। জেলাটির ৭৬% চিকিৎসকের পদ শূণ্য। যা সম্ভবত সারা দেশর সর্বনিম্ন। বরগুনায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও অনেক। ইতোমধ্যে দু জনের মৃত্যুও হয়েছে ঐ রোগে। এ জেলা সদর থেকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুরত্ব ১শ কিলোমিটারের মত। চিকিৎসক সংকেট অবহেলিত এ জেলাটিতে সরকারী চিকিৎসা সেবা বলতে এখন আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই।

এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলা পর্যায়ের ৩১ শয্যার হেলথ কমপ্লেক্সগুলো ৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার ঘোষনা দেয়া হলেও জনবল মঞ্জুরী রয়েছে পুরনো হিসেবে। আর ৩১শয্যার মঞ্জুরীকৃত সেসব পদেরও অর্ধেকের বেশী শূণ্য। কোন কোন উপজেলায় ১০জনের স্থলে মাত্র দুজন ডাক্তার কর্মরত আছেন।

পটুয়াখালী জেলা সদরের হাসপাতালটিকে আড়াইশ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মান করে মেডিকেল কলেজের সাথে সংযুক্ত করা হলেও চিকিৎসক সহ জনবল মঞ্জুরী রয়েছে ৫০ শয্যা হাসপাতালের। আর সে মঞ্জুরীর অর্ধেকেরও বেশী পদ শূণ্য। পটুয়াখালী সদর সহ ৭টি উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ২২৩ হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৮৪ জন। জেলাটিতে ৬৩% চিকিৎসকের পদ শূণ্য। এবার পটুয়াখালীতেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রচুর। জেলা সদরের বাইরে ৬টি উপজেলা হাসপাতালেরও করুন দশা। এ জেলাটির সাগর পাড়ের কুয়াকাটা ২০ শয্যার হাসপাতালে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন চিকিৎসক।

দ্বীপজেলা ভোলা সদরের ১শ শয্যার হাসপাতালটি আড়াইশ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষনা সহ অবকাঠামো নির্মান করা হলেও চিকিৎসক আর জনবল মঞ্জুরী রয়েছে ৫০ শয্যার। তবে মঞ্জুরীকৃত সে পদেরও অর্ধেক পদে কোন চিকিৎসক নেই। এ জেলাটির ২০৯টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭২জন। জেলাটির ৬৬ ভাগ চিকিৎসকের পদ শূণ্য পড়ে আছে।

পিরোজপুর জেলার ১৭২টি চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৬১ জন। জেলাটির ৬৫% চিকিৎসকের পদ শূণ্য। এ জেলা সদরের ১শ শয্যার হাসপতালটিও চলছে ৫০ শয্যার চিকিৎসক সহ জনবল মঞ্জুরী নিয়ে। তবে মঞ্জুরীকৃত সেসব পদেরও অর্ধেকের বেশী শূণ্য। উপজেলা হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরো করুন।

ঝালকাঠী জেলা সদর সহ ৪টি উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ১০৪ হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৪০জন। এ জেলাটিতেও ৬২% চিকিৎসকের পদশূণ্য।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাদে বরিশালে জেলা সদরের জেনারেল হাসপাতাল এবং ১০টি উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ২৫৮ হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১১৩ জন। বিভাগীয় সদরের এ জেলাটির চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদের ৫৭%-এ কোন ডাক্তার নেই।

সদর হাসপাতালের ৩২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫জন। তবে এ সংখ্যাই দক্ষিনাঞ্চলের অন্য সব হাসাপাতালের মধ্যে সর্বাধীক বলে জানা গেছে। এছাড়া বরিশালের চাখার, ঝালকাঠীর কির্তীপাশা ও ভোলার চরআইচা ২০ শয্যার হাসপাতালগুলোও চলছে (?) মঞ্জুরীকৃত পদের ২৫-৩০% চিকিৎসক দিয়ে।

অবহেলিত দক্ষিণের জনপদে সরকারী চিকিৎসা পরিসেবা ক্রমশ জনগনের অধরা হয়ে উঠছে বল অভিযোগ সবার। চিকিৎসক সংকটে দেশ জুড়ে যে ডেঙ্গুজ্বরের বিস্তার ঘটছে, তার চিকিৎসা সেবায় দক্ষিণাঞ্চলে স্বাস্থ্য প্রশাসন হীমশীম খাচ্ছেন। দূর্ভোগ আর স্বাস্থ্য ঝুকিতে রোগীরা। এ অঞ্চলের ৬টি জেলার ৪২টি উপজেলা জুড়ে চিকিৎসকের অভাব ক্রমাগত মানবিক সংকট তৈরী করলেও তা থেকে উত্তরনের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। তবে বরিশালে বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে ‘চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি উর্ধতন কতৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে অবহিত করা’র কথা জানান হয়েছে।